
সময়ের চাপে রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম,
মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দীঃ বর্তমান সময় এক অস্থির ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার নাম। প্রযুক্তিগত বিপ্লব যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি সমাজে তৈরি করেছে নতুন বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি। বৈশ্বিক রাজনীতি থেকে শুরু করে স্থানীয় অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম—এই তিন শক্তির ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
তথ্যের যুগে বিভ্রান্তির ঝুঁকি
ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারের ফলে তথ্য এখন আর কোনো একক কর্তৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইউটিউব চ্যানেল—সব মিলিয়ে সংবাদ গ্রহণের পরিসর বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে আছে ভয়াবহ ঝুঁকি। যাচাইহীন খবর, গুজব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য খুব সহজেই জনমতকে বিভ্রান্ত করছে।
এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্ব শুধু খবর প্রকাশে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সত্য যাচাই, প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা এবং দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়েই গণমাধ্যমকে তার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে হবে। ক্লিকবেইট শিরোনাম বা তড়িঘড়ি প্রকাশের প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমের ওপরই মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
অর্থনৈতিক চাপ ও সাধারণ মানুষের জীবন
আজকের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ—সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। কর্মসংস্থানের বাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়ছে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য।
এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে জনগণ। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এখন সময়ের দাবি। উন্নয়নের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি উন্নয়নের সুফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য।
জলবায়ু সংকট ও টেকসই উন্নয়ন
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাব্য বিপদ নয়—এটি বর্তমানের নির্মম বাস্তবতা। ঘন ঘন বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ ও ঘূর্ণিঝড় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন।
অতএব উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটতে হবে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিটি ধাপে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাস্তব পরিবর্তন আনতে।
মতপ্রকাশ, সহনশীলতা ও সামাজিক বন্ধন
বর্তমান সমাজে আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো মতভিন্নতার প্রতি অসহিষ্ণুতা। রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস বা সামাজিক অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলশ্রুতিতে সামাজিক সংলাপ দুর্বল হচ্ছে, বাড়ছে বিভাজন।
গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্বশীল বক্তব্য ও সহনশীল আচরণও অপরিহার্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে এই সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
সামনে এগোনোর পথ
এই সংকটময় সময়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক সাহস। রাষ্ট্রকে হতে হবে জনমুখী, গণমাধ্যমকে হতে হবে সত্যনিষ্ঠ ও সাহসী, আর নাগরিকদের হতে হবে সচেতন ও দায়িত্বশীল। সমস্যা অস্বীকার করে নয়, বরং স্বীকার করে সমাধানের পথে হাঁটলেই কেবল একটি স্থিতিশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আজকের প্রেক্ষাপটে তাই প্রশ্ন একটাই—আমরা কি দায়িত্ব এড়িয়ে যাব, নাকি দায়িত্ব নিয়ে সময়ের মুখোমুখি হব? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেই উত্তর আমাদের আজই দিতে হবে।
#মোহাম্মদ_মহররম_হোসেন_মাহ্দী
#সম্পাদক_ও_প্রকাশক
#আমাদের_চ্যানেল #সময়ের_প্রেক্ষাপট
#আজকের_বাস্তবতা
#CurrentAffairs #Editorial #Opinion
Leave a Reply