
দশই জানুয়ারি: শেকলভাঙা সূর্যের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও পূর্ণতার ইতিহাস
শব্দে সময়কে প্রশ্নকারী এক নাগরিক কন্ঠ
আশরাফুল আলম তাজ
ভূমিকা: বিজয়ের অসম্পূর্ণ ক্যানভাস
১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির ললাটে বিজয়ের রক্ততিলক আঁকা হয়েছিল, কিন্তু সেই উল্লাসের অন্তঃস্থলে ছিল এক গভীর বিষাদ। স্বাধীনতার মানচিত্র তখনো স্বজনহারা আর্তনাদে সিক্ত, পোড়া মাটির গন্ধে ভারাক্রান্ত। বিজয়ের নিশান উড়ছিল, অথচ তার ছায়াতলে দাঁড়িয়ে জাতি অনুভব করছিল এক প্রচণ্ড শূন্যতা। কারণ যাঁর তর্জনীর ইশারায় একটি নিরস্ত্র জনগোষ্ঠী সশস্ত্র মহাকাব্যে অবতীর্ণ হয়েছিল, সেই মহানায়ক তখনো দূর পরবাসে যমপুরীর অন্ধকারে বন্দি। দশই জানুয়ারি ১৯৭২ তাই কেবল একটি তারিখ নয়—এটি সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যেদিন স্বাধীনতার মানচিত্র তার ধ্রুবতারাকে পুনরুদ্ধার করেছিল। এটি ছিল এক অসম্পূর্ণ মহাকাব্যের পরিপূর্ণতা।
অগ্নিপরীক্ষা ও বন্দি আত্মা
নয় মাসের দহন শেষে যখন বাংলাদেশ ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন সূর্যকে অভিবাদন জানাচ্ছিল, বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের নির্জন প্রকোষ্ঠে মৃত্যুকে নিত্যসঙ্গী করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শেকলের ঝনঝনানি তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং তাঁর অদম্য সংকল্পই হয়ে উঠেছিল বাংলার কোটি মানুষের সংগ্রামের অদৃশ্য জ্বালানি। তাই তাঁর মুক্তি কোনো একক ব্যক্তির মুক্তি ছিল না—তা ছিল অবরুদ্ধ বাংলাদেশের বন্দি আত্মার শিকলভাঙা উচ্চারণ। পাকিস্তানের কারাগারের লোহার দরজা যখন ভেঙে পড়েছিল, ইতিহাস সেদিন আবারও প্রমাণ পেয়েছিল—সত্য ও ন্যায়ের কণ্ঠরোধ কোনো আসুরিক শক্তির পক্ষেই স্থায়ী নয়।
জনসমুদ্রের জোয়ার: যখন মাটি ও মানুষ একাকার
দশই জানুয়ারির সেই দুপুরে ঢাকার আকাশ ও মাটি মিলেমিশে গিয়েছিল মানুষের অবিমিশ্র আবেগে। তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান—সমগ্র নগরী রূপ নিয়েছিল এক উত্তাল জনসমুদ্রে। সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; ছিল কেবল নাড়িছেঁড়া ধনকে ফিরে পাওয়ার আদিম আকুলতা। যখন দীর্ঘদেহী সেই মানুষটি বিমানের সিঁড়ি বেয়ে নামলেন, বাংলার মাটি যেন ধন্য হলো তাঁর চরণস্পর্শে। চোখের অশ্রু ও কণ্ঠের জয়ধ্বনি মিলেমিশে সেদিন একাকার হয়ে গিয়েছিল। সেই মুহূর্তেই স্বাধীনতা রাজনৈতিক শব্দের সীমা অতিক্রম করে জীবন্ত বাস্তবতায় রূপ নেয়—বাঙালি প্রথমবার গভীরভাবে অনুভব করেছিল, আমরা সত্যিই মুক্ত।
রাষ্ট্র নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর ও নতুন সংগ্রাম
এই প্রত্যাবর্তন ছিল আবেগের বিস্ফোরণ নয়; ছিল সদ্যজাত রাষ্ট্রের সার্বভৌম অস্তিত্বের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ—যেখানে ঘর ছিল পোড়া, স্বপ্ন ছিল ক্ষতবিদ্ধ—সেই ভূমিতে বঙ্গবন্ধু এনে দিলেন নৈতিক দৃঢ়তা ও ভবিষ্যতের নির্ভীক সাহস। রেসকোর্সের সেই ভাষণ হয়ে উঠল রাষ্ট্র নির্মাণের প্রথম দিকনির্দেশনা। তিনি স্মরণ করিয়ে দিলেন—স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তাকে রক্ষা করা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক রাষ্ট্রে রূপ দেওয়া অনেক বৃহৎ সংগ্রাম। তাঁর উপস্থিতিতেই জাতি আবার ফিরে পেল হিমালয়সম আত্মবিশ্বাস।
উপসংহার: কালজয়ী চেতনার চিরন্তন আলোকবর্তিকা
দশই জানুয়ারি কোনো নির্দিষ্ট বর্ষের স্মৃতিতে আবদ্ধ নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের পথচলার অনিবার্য প্রেরণা। এই দিন শিক্ষা দেয়—নেতা ও জনগণের আত্মিক বন্ধনই একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষাকবচ। আজকের এই দিনে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন মানে কেবল তাঁর স্বদেশে ফিরে আসা নয়; বরং তাঁর আদর্শ, দায়বদ্ধতা ও স্বপ্নে বারবার আমাদের প্রত্যাবর্তন। ইতিহাসে এই দিনটি তাই চিরকাল অম্লান থাকবে—কারণ এখানে একটি জাতি তার হারানো হৃদপিণ্ড ফিরে পেয়েছিল, আর একজন মহাপ্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় স্বদেশ ও জনগণ।
Leave a Reply