
নবনির্বাচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সদস্যবৃন্দের প্রতি
এক বিনম্র খোলা চিঠি
কলমে: আশরাফুল আলম তাজ
হে নবীন ও প্রবীণ জনপ্রতিনিধিবৃন্দ,
মাঘের সংযত প্রভাতে, যখন শীতের অন্তিম নিস্তব্ধতা আপন আলোকে ধীরে ধীরে মুড়ে নিচ্ছে, আর দিগন্তের ওপারে বসন্তের আগমনী রঙ মৃদু আভাসে জাগিয়ে তুলছে নবজীবনের সুর, ঠিক সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আপনাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো শপথের গুরুগম্ভীর উচ্চারণ। ঋতুপরিবর্তনের এই অনিবার্য অভিযাত্রার মতোই জাতিও আজ এক নব অধ্যায়ের প্রারম্ভে দাঁড়িয়ে—সংযম থেকে সৃজনের দিকে, প্রতীক্ষা থেকে প্রত্যয়ের দিকে, সম্ভাবনা থেকে বাস্তবতার দিকে।
ধূলিধূসর এই জনপদের বুকে যেমন বসন্তের প্রথম কুসুম ফুঁটে ওঠে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, তেমনি কোটি প্রাণের সঞ্চিত আকাঙ্ক্ষা ও আস্থার সলতে প্রজ্বলিত করে আপনারা পদার্পণ করলেন জাতীয় সংসদের পবিত্র অলিন্দে। এ আগমন কেবল বিজয়ের উল্লাস নয়; এ এক দায়িত্বের দীপ্ত গ্রহণ, এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকারের অবগাহন।
সাধারণ নাগরিকদের পক্ষ থেকে আপনাদের জানাই সশ্রদ্ধ অভিনন্দন ও আন্তরিক স্বাগতম।
মতভেদের ঊর্ধ্বে ঐক্যের মহাযাত্রা
রাজনীতির প্রকৃতি মতভেদে দীপ্ত, বিতর্কে প্রাণবন্ত। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের মহত্তর প্রেক্ষাপটে বিভাজনের প্রাচীর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে জাতি ঐক্যে সংহত, সে জাতিই অগ্রযাত্রায় অদম্য।
আমরা প্রত্যাশা করি, দলীয় রেখার সীমা অতিক্রম করে আপনারা জাতীয় কল্যাণের বৃহত্তর মানচিত্রে একসূত্রে আবদ্ধ হবেন। সংসদের অঙ্গন হোক যুক্তির গীতিময় সভা, শালীনতার বিদ্যালয় এবং প্রজ্ঞার প্রাঙ্গণ। বিরোধিতা হোক নীতিনিষ্ঠ, সমর্থন হোক তথ্যসমৃদ্ধ; ভাষা হোক দৃঢ় কিন্তু শিষ্ট, অবস্থান হোক অটল কিন্তু মানবিক।
নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন ও সমৃদ্ধির দীপশিখা
বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দিগন্তে অবস্থান করছে। উন্নয়নের অভিযাত্রা বহমান; তবু সেই অগ্রযাত্রাকে শাশ্বত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে প্রয়োজন নৈতিক দৃঢ়তা ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ।
“ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে বড় দেশ”—এই চিরন্তন বোধকে অন্তরে ধারণ করে আপনারা যদি জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন, তবে শপথের শব্দ বাস্তবতার মাটিতে দৃঢ় ভিত্তি পাবে।
আপনাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হোক দুর্নীতির রাহুগ্রাসমুক্ত; প্রতিটি নীতি হোক বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর। ক্ষমতা যেন মোহের অলংকার না হয়ে দায়িত্বের শপথে রূপান্তরিত হয়। কৃষকের ক্ষেতে, শ্রমিকের ঘামে, শিক্ষার্থীর স্বপ্নে, গবেষকের প্রজ্ঞায়—রাষ্ট্রের প্রতিটি নীতি যেন সমান মর্যাদায় প্রতিফলিত হয়।
মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের প্রত্যাশা
আমরা এমন এক সংসদের স্বপ্ন দেখি, যেখানে অসহিষ্ণুতা নির্বাসিত হবে এবং সংলাপ হবে প্রধান অনুশীলন; যেখানে কণ্ঠরোধ নয়, মতপ্রকাশের মর্যাদা রক্ষিত হবে; যেখানে প্রতিহিংসা নয়, সহমর্মিতা শক্তির উৎস হবে।
আপনাদের কলম ও কণ্ঠ যেন শোষিতের পক্ষে উচ্চারিত হয়। মেহনতি মানুষের ঘামভেজা স্বপ্নগুলো যেন আইনি কাঠামোর সুরক্ষিত আশ্রয় লাভ করে। তরুণ প্রজন্ম যেন আপনাদের কর্মকাণ্ডে উপলব্ধি করে—রাজনীতি ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, এটি নৈতিকতার এক মহৎ সাধনা।
ইতিহাসের প্রাঙ্গণে আপনাদের পদচিহ্ন
ইতিহাস নির্লিপ্ত, কিন্তু স্মৃতিধারী; সে শ্রদ্ধা জানায় ত্যাগকে, অমরত্ব দেয় সততাকে, আর বিস্মৃতির অতলে নিক্ষেপ করে স্বার্থপরতাকে। আজ আপনারা সেই ইতিহাসের সম্মুখে অবস্থান করছেন।
আপনাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি উচ্চারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মূল্যায়নের বিষয় হবে। সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে গেলে ত্রয়োদশ সংসদ এক নজিরবিহীন অধ্যায়ে পরিণত হবে—যা সময়ের স্রোত পেরিয়েও দীপ্ত থাকবে।
পরিশেষ:
হে গণপ্রতিনিধিবৃন্দ, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ অনন্ত; পদমর্যাদা সীমাবদ্ধ, কিন্তু কর্মের মহিমা অসীম। আসুন, ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে গড়ে তুলি এক সমৃদ্ধ, আধুনিক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ।
আপনাদের প্রজ্ঞা, সততা ও আত্মত্যাগেই রচিত হোক আগামী দিনের মহাকাব্য। জাতির প্রত্যাশা আপনাদের প্রতি নিবেদিত; আস্থা আপনাদের উপর অর্পিত।
বিনীত নিবেদক,
আশরাফুল আলম তাজ
বাংলাদেশের এক সচেতন নাগরিক
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
Leave a Reply