
“প্রজাতন্ত্রের শক্তি ও হৃৎস্পন্দন: কাচের প্রাসাদ নাকি জীবন্ত সংবিধান?
বর্জনের সংস্কৃতি ও জনমতের কক্ষপথে এক কালজয়ী অনুসন্ধান”
আশরাফুল আলম তাজ
প্রাক্-কথন: রাষ্ট্রের হৃদয় কোথায় স্পন্দিত হয়?
প্রজাতন্ত্র কোনো স্থির ভাস্কর্য নয়, কোনো শীতল প্রশাসনিক কাঠামোও নয়। এটি এক জীবন্ত সত্তা—যার হৃৎস্পন্দন শোনা যায় জনতার নিঃশ্বাসে, যার রক্তপ্রবাহ চলে মতের বৈচিত্র্যে। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি সংরক্ষিত থাকে না কেবল সংবিধানের অনুচ্ছেদে কিংবা ক্ষমতার অলিন্দে; তা নিহিত থাকে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সেই অলিখিত সামাজিক চুক্তিতে, যেখানে প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করে—তার কণ্ঠস্বর অর্থবহ, তার উপস্থিতি প্রয়োজনীয়।
কিন্তু যখন সেই কণ্ঠস্বরের বৃহৎ অংশকে সচেতনভাবে নীরব করা হয়, যখন অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত হয়ে আসে, তখন প্রজাতন্ত্রের শরীরে জন্ম নেয় এক নিঃশব্দ ব্যাধি। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক ও উৎসবমুখর মনে হলেও ভেতরে ভেতরে জমে ওঠে আস্থাহীনতার এক জমাটবদ্ধ অন্ধকার। এই প্রবন্ধ সেই অন্ধকারেরই ব্যবচ্ছেদ এবং একই সঙ্গে আলোর অভিমুখে ফেরার এক নৈতিক আহ্বান।
গণতন্ত্রের ক্যানভাস ও ভাঙা সামাজিক চুক্তি
গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার যোগফল নয়; এটি একটি বহুবর্ণিল ক্যানভাস। সেখানে প্রতিটি মত, প্রতিটি অবস্থান, প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তি এক একটি অপরিহার্য রঙ। কোনো একটি প্রধান রঙ মুছে গেলে পুরো চিত্রটি অসম্পূর্ণ ও বিবর্ণ হয়ে পড়ে। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা মানে শুধু একটি দলকে বাদ দেওয়া নয়—এটি কোটি নাগরিকের আত্মাকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার নামান্তর।
যে নির্বাচন সর্বজনীন হওয়ার কথা, তা যখন নিয়ন্ত্রিত উৎসবে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র বর্ণান্ধের মতো কেবল নিজের পছন্দের রঙেই ছবি আঁকতে চায়। এই ছবি হয়তো সাময়িকভাবে ঝকঝকে দেখায়, কিন্তু তা গভীরতাহীন; দৃষ্টিনন্দন হলেও প্রাণহীন। এমন গণতন্ত্র ক্ষমতার সুবিধা দিলেও নৈতিক বৈধতা সৃষ্টি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
বর্জনের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সতর্ক পুনরাবৃত্তি
ইতিহাস কখনো নীরব দর্শক নয়; সে বারবার সতর্ক করে। পৃথিবীর যে প্রান্তেই ‘একক সত্য’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে এবং ভিন্নমতকে রাষ্ট্রদ্রোহ বা অপ্রয়োজনীয় বলে দমিয়ে রাখা হয়েছে, সেখানেই রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে বর্জন করা মানে কেবল একটি বিরোধী অবস্থানকে দুর্বল করা নয়; বরং একটি বিশাল জনসমষ্টিকে রাষ্ট্রবিমুখ করে তোলা।
এখানে সৃষ্টি হয় এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক শূন্যতা। পদার্থবিজ্ঞানের মতোই রাজনীতিতেও শূন্যস্থান দীর্ঘদিন শূন্য থাকে না। আজ যে রুদ্ধশ্বাস শূন্যতা তৈরি হচ্ছে, কাল তা পূরণ হতে পারে উগ্রবাদ, প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি কিংবা অসাংবিধানিক শক্তির দ্বারা। অতএব, বর্জন কোনো সমাধান নয়—এটি আগামীর এক প্রলয়ঙ্করী অস্থিরতার বীজ বপন মাত্র।
প্রজাতন্ত্রের শক্তি বনাম ক্ষমতার দাপট
প্রজাতন্ত্রের শক্তি জন্ম নেয় অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ থেকে। সেখানে মতের প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত থাকে একটি ‘যৌথ প্রজ্ঞা’ বা Collective Wisdom। এই প্রজ্ঞাই রাষ্ট্রকে দেয় দীর্ঘস্থায়ী আত্মরক্ষার ক্ষমতা। অন্যদিকে, ক্ষমতার দাপট গড়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণ, ভীতি এবং প্রশাসনিক কৌশলের ওপর। বাইরে থেকে এই শক্তিকে অজেয় মনে হলেও ভেতরে তা অত্যন্ত ফাঁপা।
যে রাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ভয় পায়, সে আসলে নিজের অস্তিত্বের বৈধতাকেই পরোক্ষভাবে সন্দেহ করে। যখন বড় একটি পক্ষ অনুপস্থিত থাকে, তখন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সুরক্ষা-কবচ ভেঙে পড়ে। তখন প্রজাতন্ত্র হয়ে ওঠে কাচের প্রাসাদ—দূর থেকে ঝলমলে, কিন্তু সামান্য আঘাতেই চূর্ণ হওয়ার মতো ভঙ্গুর।
আস্থাহীনতার অন্ধকার: এক মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়
আগামীর যে অন্ধকারের পদধ্বনি আমরা শুনছি, তা কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়; তা গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক। যখন একজন সাধারণ নাগরিক মনে করেন—“আমার ভোটে কিছু আসে যায় না”—ঠিক সেই মুহূর্তে প্রজাতন্ত্র এক অপূরণীয় পরাজয় স্বীকার করে নেয়। এই উদাসীনতা ধীরে ধীরে মানুষের সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম এবং নাগরিক দায়িত্ববোধকে গ্রাস করে ফেলে।
মানুষ তখন রাষ্ট্রের ভেতরে আর নিজেকে খুঁজে পায় না। সে তখন বিকল্প পরিচয় বা ভ্রান্ত আনুগত্যের সন্ধান করে। এই গণ-বিচ্ছিন্নতাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে ভয়ংকর অন্ধকার—যেখানে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির জায়গা দখল করে নেয় প্রতিহিংসা, অনাগ্রহ কিংবা অন্ধ চরমপন্থা।
প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব
একটি সচল প্রজাতন্ত্রের মেরুদণ্ড হলো তার প্রতিষ্ঠানসমূহ। যখন একটি নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়, তখন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো স্তম্ভগুলো তাদের নিরপেক্ষতার বর্ম হারিয়ে ফেলে। তারা তখন আর প্রজাতন্ত্রের ভৃত্য থাকে না, বরং ক্ষমতার অংশীদার বা অনুচর হয়ে ওঠে।
এই নৈতিক দেউলিয়াত্ব রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমন এক ক্ষয়রোগ ছড়িয়ে দেয়, যা নিরাময় করতে কয়েক প্রজন্ম লেগে যায়। প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জনমানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন ‘আইন’ তার পবিত্রতা হারায়—আর এই বিশৃঙ্খলা থেকেই জন্ম নেয় এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ, যেখানে ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
বিশ্বায়ন, ভূ-রাজনীতি ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি
একবিংশ শতাব্দীতে কোনো রাষ্ট্রই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। একটি প্রশ্নবিদ্ধ বা একপাক্ষিক নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করে না, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও রাষ্ট্রকে অত্যন্ত দুর্বল ও একা করে তোলে। যখন নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তি ক্ষয়ে যায়, তখন বহিঃশক্তির চাপ ও অন্যায্য শর্ত আরোপের সুযোগ তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কূটনৈতিক দূরত্ব এবং বৈশ্বিক ভাবমূর্তির অবক্ষয়—এ সবই সেই আসন্ন অন্ধকারের অংশ। একটি কৃত্রিম উৎসবের মোহে পড়ে রাষ্ট্র যখন তার দীর্ঘমেয়াদী সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলে, তখন সেই উৎসব ইতিহাসের কাঠগড়ায় অপরাধী হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়ে।
মেধার নির্বাসন ও চাটুকারিতার আধিপত্য
অন্তর্ভুক্তিহীন রাজনীতি কেবল বিরোধী পক্ষকে নয়, বরং দেশের মেধাবী ও বিবেকবান অংশকেও রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করে। যখন আনুগত্যই যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হয়, তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মেধাবীদের জায়গা দখল করে নেয় মোসাহেবরা। এর ফলে রাষ্ট্র তার উদ্ভাবনী শক্তি ও দূরদর্শিতা হারায়। একটি দেশ যখন চাটুকারদের স্বর্গে পরিণত হয়, তখন সেই দেশের পতন ত্বরান্বিত হয়—ইতিহাসের এই অমোঘ সত্যটিই আমাদের বর্তমান উৎসবের পেছনে দীর্ঘ ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।
উত্তরণের পথ: অন্তর্ভুক্তির নৈতিক সাহস
প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়; এটি একটি বাগান। সেখানে ভিন্ন বর্ণের, ভিন্ন ঘ্রাণের ফুল ফুটবেই—এটাই প্রকৃতির নিয়ম এবং এটাই তার সৌন্দর্য। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সংলাপ, সহনশীলতা এবং প্রকৃত জাতীয় পুনর্মিলন। বর্জনের সংস্কৃতি পরিহার করে অন্তর্ভুক্তির রাজনীতিতে ফিরে আসা ছাড়া আমাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো প্রশস্ত পথ নেই।
এটি দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং এটিই হলো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নৈতিক সাহসের সর্বোচ্চ প্রকাশ। ইতিহাস প্রমাণ করে, সমঝোতার পথে হাঁটতে পারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত আভিজাত্য।
উপসংহার: মহাকালের আদালতে প্রজাতন্ত্র
মহাকালের অমোঘ বিচারে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার দাপট জয়ী হয় না, জয় হয় ন্যায়ের। একটি বৃহৎ সত্যকে অস্বীকার করে কিংবা কোটি মানুষের কণ্ঠকে উপেক্ষা করে দীর্ঘকাল শাসন করা সম্ভব নয়। আজ যে বিভাজন সাময়িক বিজয়ের ভ্রম তৈরি করছে, তাতে জয়ী হচ্ছে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, কিন্তু পরাজিত হচ্ছে খোদ ‘রাষ্ট্র’।
তবুও অন্ধকার শেষে আলোর প্রত্যাশা চিরন্তন। মেঘ যত ঘনই হোক, সূর্য তার কক্ষপথ হারায় না। তেমনি সত্য ও অন্তর্ভুক্তির রাজনীতিও একদিন তার হারানো মহিমায় ফিরে আসবেই। সেই দিনই প্রজাতন্ত্র তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—জনমতের অবাধ কল্লোলে, কোনো কৃত্রিম বাঁধের আড়ালে নয়।
Leave a Reply