
ব্যালটের অগ্নিপরীক্ষা: জনমতই ইতিহাসের শেষ বিচারক
— আশরাফুল আলম তাজ
উপক্রমণিকা
গণতন্ত্র কেবল একটি যান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নয়; এটি একটি জাতির সামষ্টিক আত্মিক ও রাজনৈতিক চেতনার এক প্রদীপ্ত মহাকাব্য। এখানে ক্ষমতার উৎস কোনো নিগূঢ় বলয় বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর আস্ফালন নয়, বরং তা আপামর জনসাধারণের সার্বভৌম ও অনাবিল ইচ্ছার প্রতিফলন। রাজনৈতিক দর্শনের ধ্রুপদী প্রেক্ষাপটে বিচার করলে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট—কোনো শক্তির রাজনৈতিক শুদ্ধি কিংবা পতন কেবল রাজপথের সাময়িক উত্তাপ অথবা রাষ্ট্রযন্ত্রের যান্ত্রিক সিদ্ধান্তে চিরস্থায়ী হতে পারে না; তার জন্য অপরিহার্য হলো ব্যালটের অমোঘ, নিরপেক্ষ ও অগ্নিময় অগ্নিপরীক্ষা।
বেদীতলের পবিত্রতা ও গণ-আদালত
গণতন্ত্রের বেদীতল তখনই তার শাশ্বত পবিত্রতা রক্ষা করে, যখন সেখানে সকল মত ও পথের বিচার সম্পন্ন হয় সরাসরি জনগণের দ্বারা। আজ যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রাবল্যে এবং কৃত্রিম বলয় তৈরির মাধ্যমে কোনো বিশেষ শক্তিকে নির্বাচনের আঙিনা থেকে নির্বাসিত করছেন, তারা হয়তো ক্ষমতার দম্ভে সাময়িক স্বস্তি পাচ্ছেন; কিন্তু ইতিহাসের নির্মম কাঠগড়ায় একদিন তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা কেবল গণতন্ত্রের অঙ্গহানিই করে না, বরং সেই নির্বাচনের নৈতিক বৈধতাকে এক অনিবার্য ও সুতীক্ষ্ণ ‘প্রশ্নচিহ্নের চাবুক’ হয়ে আঘাত করে। এই ক্ষত ইতিহাসের পাতায় অমলিন থেকে যায় এবং উত্তরপ্রজন্মের কাছে বর্তমানের নীতিনির্ধারকদের চিরকাল দায়বদ্ধ করে রাখে।
ফ্যাসিবাদ বনাম ব্যালটের রুদ্ররূপ
ফ্যাসিবাদ সর্বদাই কণ্ঠরোধ এবং একপাক্ষিক ক্ষমতার চোরাবালিতে নিজের সুরক্ষার নীলনকশা খোঁজে। বিপরীতে, গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি নিহিত থাকে অন্তর্ভুক্তির মহান উদারতায়। কোনো শক্তি যদি সত্যিই ফ্যাসিবাদী চরিত্রে কলঙ্কিত হয়, তবে নির্বাচনের ময়দানে তাদের উন্মুক্ত উপস্থিতিই হয়ে উঠবে তাদের রাজনৈতিক আত্মাহুতির মঞ্চ। কারণ, সচেতন ও জাগ্রত জনগণের হাতে ব্যালট পেপার তখন আর নিছক সামান্য কাগজ থাকে না; তা রূপ নেয় শোষণের বিরুদ্ধে একেকটি জ্বলন্ত শিখা ও বজ্রকঠিন প্রত্যয়ে। মহাকালের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—কোনো আদর্শকে আইনি ফতোয়ায় নিষিদ্ধ করার চেয়ে জনগণের অমোঘ রায়ে রাজনৈতিকভাবে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ করে তোলাই হলো অধিকতর শক্তিশালী, স্থায়ী ও নৈতিক বিজয়।
নির্বাচনী বৈধতা ও মহাকালের বিচার
একটি সর্বজনীন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই হলো প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা। যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার করে কোনো পক্ষকে সচেতনভাবে মূলধারার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন সেই নির্বাচন তার নৈতিক গাম্ভীর্য হারায় এবং তা নিছক একপাক্ষিক ক্ষমতা দখলের প্রহসনে পরিণত হয়। যারা আজ এই বর্জন ‘এর রাজনীতিতে মত্ত, তারা প্রকারান্তরে নিজেদের ভীরুতা এবং জনমতের প্রতি গভীর অনাস্থাই বিশ্বের দরবারে উন্মোচিত করছেন। কিন্তু স্মরণ রাখা প্রয়োজন—জনশক্তির প্রবল প্লাবনে কোনো কৃত্রিম বাঁধ কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ইতিহাসকে আপন হাতের মুঠোয় বন্দি করার ধৃষ্টতা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের নির্মম আঘাতেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।
উপসংহার
পরিশেষে, রাজনীতির চূড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়া উচিত ব্যালট বাক্সের সেই স্বচ্ছ কাঁচের অন্তরালে—জনগণের চোখের সামনে; রাষ্ট্রের কোনো অন্ধকার কুঠুরিতে বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে নয়। ব্যালটের সেই পবিত্র অগ্নিকুণ্ডে যদি কোনো দল ভস্মীভূত হয়, তবেই দেশ ও জাতি কলঙ্কমুক্ত হওয়ার প্রকৃত রাজপথে অগ্রসর হয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাখ্যান কোনো সাময়িক প্রশাসনিক আদেশের চেয়েও বহু গুণ বেশি মর্যাদাহানিকর এবং তা-ই চূড়ান্ত। কারণ, জনতাই ইতিহাসের প্রকৃত স্থপতি এবং শেষ বিচারক। যারা আজ দম্ভভরে জনমতকে অবজ্ঞা করছেন, তাদের একটি ধ্রুব সত্য স্মরণে রাখা উচিত—ইতিহাসের চাকা যখন তার আপন গতিতে আবর্তিত হয়, তখন কোনো আস্ফালন বা যান্ত্রিক শক্তিই তাকে রুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে না।
Leave a Reply