
ইতিহাসের ধ্রুবতারা ও রাজনীতির চোরাবালি: প্রথম প্রতিরোধের দালিলিক সত্য
কলমে: আশরাফুল আলম তাজ
ভূমিকা
ইতিহাস কোনো নমনীয় কাদামাটি নয় যে, ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক প্রয়োজনের ছাঁচে তাকে ইচ্ছেমতো অবয়ব দেওয়া যাবে; ইতিহাস হলো তপ্ত রক্তে উৎকীর্ণ এক অবিনশ্বর দর্পণ। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বীরত্ব ও বিদ্রোহের যে মহাকাব্য রচিত হয়েছিল, তা কোনো একক ব্যক্তির একক কীর্তি নয়—বরং তা ছিল সহস্র প্রাণের সম্মিলিত স্পন্দন। সম্প্রতি সমকালীন রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে কেন্দ্র করে যে বয়ান উপস্থাপিত হয়েছে, তা ইতিহাসের শাশ্বত কাঠামোর ওপর এক সূক্ষ্ম ও উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্নচিহ্ন আরোপ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, অন্ধ আবেগের ধূম্রজালে নয়—সত্যের নির্মোহ আলোতেই ইতিহাসের পাঠ পুনর্বিবেচনা আজ সময়ের দাবি।
প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ: মেজর রফিকের কালানুক্রমিক শ্রেষ্ঠত্ব
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনার প্রশ্নে ইতিহাসের দলিল ও সাক্ষ্য হিমাদ্রির ন্যায় অটল। তৎকালীন ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম—পরবর্তীকালে মেজর—এই অধ্যায়ের অবিসংবাদিত অগ্রদূত হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত। ২৫শে মার্চের কালরাত্রি যখন আসন্ন বিভীষিকার বার্তাবাহক হয়ে ঘনিয়ে আসছিল, তখন প্রথাগত সামরিক শৃঙ্খলের লৌহকপাট ভেঙে অসীম সাহসিকতায় তিনি বিদ্রোহের প্রথম মশাল প্রজ্বলিত করেন।
ইতিহাসের অমোঘ সত্য এই যে, রাত তখন আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিট। পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার পূর্বেই চট্টগ্রামের হালিশহর ও রেলওয়ে হিল এলাকায় ইপিআর (EPR) সদস্যদের সংগঠিত করে তিনি যে ব্যুহ রচনা করেছিলেন, তা ছিল একটি ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ বা আগাম প্রতিরোধ। বন্দরে অবস্থানরত সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস ঠেকানোর সেই দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তই ছিল মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম সশস্ত্র ঘোষণা। মেজর রফিকের নিজের লেখা ‘এ টেল অব টু উইংস’ এবং সরকারি দালিলিক সংকলনগুলো সাক্ষ্য দেয় যে, এই সংগঠিত প্রতিরোধই ছিল প্রথম পরিকল্পিত বিদ্রোহ। এই প্রতিষ্ঠিত সত্যকে উপেক্ষা করে অন্য কাউকে ‘প্রথম’ হিসেবে প্রতিস্থাপনের প্রয়াস কেবল ইতিহাসচর্চার মৌলিক নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক নয়, বরং তা এক বীরের প্রাপ্য ত্যাগের ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক তস্করবৃত্তি।
ইতিহাস পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক বয়ানের ছলচাতুরী
অলি আহমদকে ‘প্রথম বিদ্রোহী’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা মূলত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ঘটনাপ্রবাহকে সুকৌশলে পুনর্বিন্যাস করার একটি কৃত্রিম রাজনৈতিক ছক। অলি আহমদ নিঃসন্দেহে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু ইতিহাসে ‘প্রথমত্ব’ নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক স্তাবকতায় নয়—সময়ের অনুক্রম ও প্রামাণ্য দলিলের অখণ্ডতায়। একজনের অবদান মহিমান্বিত করতে গিয়ে অন্যজনের স্বীকৃত কীর্তিকে আড়াল করা ইতিহাসের প্রতি এক চরম অবিচার।
রাত ১১টা ৩০ মিনিটের পর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বিদ্রোহ সংগঠনে এবং মেজর জিয়াউর রহমানকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে অলি আহমদের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তবে সেই বিদ্রোহ ছিল একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল (Reactive) প্রতিরোধ, যা মেজর রফিকের স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহের অন্তত তিন ঘণ্টা পরের ঘটনা। রাজনৈতিক স্বার্থে এই সময়ের ব্যবধানকে মুছে ফেলার চেষ্টা আসলে ইতিহাসের ওপর মিথ্যার প্রলেপ দেওয়া।
বীরত্বের নৈতিক সংকট ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব
ইতিহাসের পাঠ যখন রাজনৈতিক সমীকরণের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন বীরত্বের ব্যাখ্যাও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। একজন সম্মুখসমরের যোদ্ধার পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান যদি এমন শক্তির সঙ্গে সাযুজ্য খোঁজে, যারা একাত্তরে স্বাধীনতার চরম বিরোধিতায় লিপ্ত ছিল—তবে তা এক গভীর দার্শনিক ও ঐতিহাসিক সঙ্কটের জন্ম দেয়। বীরত্ব কেবল রণাঙ্গনের বীরত্বে সীমাবদ্ধ নয়; বীরত্বের পূর্ণতা আসে আজীবন সেই আদর্শকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে। যখন কোনো বীরের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ইতিহাসের সত্যকে আড়াল করতে ব্যবহৃত হয়, তখন তা তাঁর নিজেরই অর্জিত মহিমাকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
উপসংহার: সত্যের শাশ্বত উত্তরাধিকার
ইতিহাস কোনো স্তাবকতার পাণ্ডুলিপি নয়। মেজর রফিকুল ইসলামের প্রজ্বলিত প্রতিরোধের প্রথম অগ্নিশিখা এবং অলি আহমদের সেই শিখাকে নিয়মিত বাহিনীর ভেতরে সঞ্চারিত করার ভূমিকা—উভয়ই স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু রাজনীতির চোরাবালিতে পা দিয়ে কাউকে কৃত্রিমভাবে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসাতে গিয়ে অন্যের ন্যায্য অধিকার হরণ করা ইতিহাসের ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সময় বহমান, কিন্তু সত্য স্থির। সত্য যখন ইতিহাসের পাতায় রক্তে লেখা হয়, তখন মিথ্যার নিপুণ অলংকারও তাকে দীর্ঘদিন আড়াল করে রাখতে পারে না। প্রতিটি বীর তাঁদের প্রকৃত ও প্রাপ্য সম্মানেই ইতিহাসে স্থায়ী হন—এটাই জাতির জন্য কল্যাণকর, এটাই ইতিহাসের শুদ্ধতা। সত্যের এই শাশ্বত আলোয় আমাদের বীরদের বিমূর্ত অহংকার মুক্ত করে চিনতে পারাটাই হোক আগামীর শ্রেষ্ঠ অর্জন।
Leave a Reply