
আদর্শের চ্যুতি ও এক মহীরুহের পতন: যখন রাজনীতি চলে যায় অশুভের করাল গ্রাসে
আশরাফুল আলম তাজ
ভূমিকা
ইতিহাসের অমোঘ সত্য এই যে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠন যখন তার অস্তিত্বের মূল শেকড় তথা আদর্শিক ভূমি থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে, তখন তার পতন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যে দলটি একসময় গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক ছিল, সেই ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’-এর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিপর্যয় আমাদের এক রূঢ় ও কণ্টকাকীর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই পতন কেবল একটি দলের ক্ষমতাচ্যুতি নয়; বরং একটি আদর্শিক কাঠামোর ওপর দুর্বৃত্তায়নের চূড়ান্ত আগ্রাসন এবং তার ফলে সৃষ্ট সামাজিক বিপর্যয়ের এক করুণ আখ্যান।
আদর্শের নির্বাসন ও ‘হাইব্রিড’ সংস্কৃতির উত্থান
যেকোনো মহীরুহের জীবনীশক্তি তার গভীরে প্রোথিত শেকড়। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে সেই শেকড় হলো তার নীতিবান ও আদর্শনিষ্ঠ কর্মী বাহিনী। কিন্তু কালক্রমে দেখা গেছে, যাদের ধমনিতে আর মজ্জায় আওয়ামী লীগের আদি মূলমন্ত্র প্রবহমান ছিল, তারা ক্রমশ কোণঠাসা ও অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়েছেন। দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত একদল সুযোগসন্ধানী বা তথাকথিত ‘হাইব্রিড’ গোষ্ঠীর একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এরা দলের অবিনাশী আদর্শকে ধারণ করেনি; বরং ক্ষমতার মধুভাণ্ডারকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে সংগঠনের অন্তস্থ সেই সহজাত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘সেলফ-কারেকশন মেকানিজম’ পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে।
রাজনীতি যখন দুর্বৃত্তদের ক্রীড়ানক
রাজনীতি যখন জনসেবার ব্রত বিসর্জন দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ আর গোষ্ঠীতন্ত্রের নিগড়ে বন্দি হয়, তখন তা আর ‘জননীতি’ থাকে না; পর্যবসিত হয় নির্মম দখলদারিত্বে। গত এক দশকে দলটির অন্দরে এক ভয়াবহ দুর্বৃত্তায়ন প্রক্রিয়ার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। যারা একনিষ্ঠ ও ত্যাগী কর্মী ছিলেন, তাদের স্থলে স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল এমন এক পরজীবী শ্রেণি, যাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, লুণ্ঠন আর পেশিশক্তির নগ্ন আস্ফালন। এই অশুভ চক্র সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করে নিজেদের আখের গুছিয়েছে, যার সামগ্রিক দায়ভার আজ আছড়ে পড়েছে গোটা সংগঠনের স্কন্ধে।
ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক কাঠামো ও জনমানুষের ক্ষোভ
এই রাজনৈতিক বিচ্যুতি ও দুর্বৃত্তায়নের সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রভাব পড়েছে আমাদের সামাজিক বুননে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সর্বত্র এক ধরণের ‘ভয় ও ত্রাসের সংস্কৃতি’ প্রোথিত হয়েছিল। সামাজিক ন্যায়বিচার যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে রাষ্ট্রের প্রতি চরম অনাস্থা ও বিরাগ তৈরি হয়। গ্রামীণ সালিশ থেকে শুরু করে নাগরিক সুবিধা—সর্বত্রই অযোগ্য ও দুর্বৃত্ত শ্রেণির আধিপত্য সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ডকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। মেধাবীদের চরম অবমূল্যায়ন আর স্তাবকদের জয়জয়কার তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে এক গভীর হাহাকার ও ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা কালক্রমে এক অপ্রতিরোধ্য সামাজিক বিস্ফোরণে রূপ নেয়।
বিবেকের পরাজয় ও জনবিচ্ছিন্নতা
একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রাণভোমরা হলো জবাবদিহিতা। কিন্তু যখন ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে যায় এবং শাসকের পরিমণ্ডল চাটুকার ও স্তাবক দিয়ে পরিবেষ্টিত থাকে, তখন তারা বাস্তবতার রুদ্রমূর্তি প্রত্যক্ষ করতে ব্যর্থ হন। আওয়ামী লীগের পতনের নেপথ্যে এই ‘আইভরি টাওয়ার’ বা জনবিচ্ছিন্ন মানসিকতা এক আত্মঘাতী ভূমিকা পালন করেছে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সামাজিক বৈষম্য যখন রাজপথে লাভাস্রোতের মতো আছড়ে পড়ে, তখন কোনো সুসংগঠিত বাহিনী বা রাজসিংহাসন সেই প্লাবনকে রুখতে পারে না।
উপসংহার: নতুন ভোরের প্রত্যাশা
আওয়ামী লীগের এই পতন আগামী দিনের রাজনীতির জন্য এক মহাকাব্যিক সতর্কবার্তা। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, দলের নাম বা ইতিহাস যতই গৌরবোজ্জ্বল হোক না কেন, বর্তমান যদি কলুষিত হয় তবে মহাকাল তাকে মার্জনা করে না। আদর্শিক কর্মীদের নির্বাসনে পাঠিয়ে যখন দুর্বৃত্তদের হাতে সমাজের চাবিকাঠি সমর্পণ করা হয়, তখন সেই ব্যবস্থার বিনাশ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
পরিশেষে, এই পতন কেবল একটি রাজনৈতিক পরাজয় নয়, বরং ক্ষমতার দম্ভ আর সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক সুতীব্র ‘ম্যান্ডেট’ বা পরম রায়। এই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই যেন উদ্ভাসিত হয় এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি—যেখানে পেশিশক্তির বদলে মেধা, তোষামোদের বদলে সততা এবং দুর্বৃত্তায়নের বদলে জনসেবাই হবে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। ইতিহাসের এই নির্মম শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সাম্যবাদী ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।
Leave a Reply