
মহাকালের দর্পণে নারী: রাজনীতির কুয়াশা ও শাশ্বত অধিকারের লড়াই,আশরাফুল আলম তাজ
ইতিহাসের তটরেখায় দাঁড়িয়ে কোনো জাতি যখন তার ভাগ্যলিপি পাঠ করে, তখন সেই জাতির অর্ধেক জনশক্তির মান-মর্যাদা ও অবস্থানই হয়ে ওঠে তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রকৃত মাপকাঠি। ২০২৬ সালের এই প্রারম্ভে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যখন এক নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায়, ঠিক তখনই ‘নারী’ ইস্যুকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের দাবদাহ সমাজ-মনস্তত্ত্বকে গভীরভাবে বিদ্ধ করছে। বিশেষত একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ডিজিটাল পরিসর থেকে বিচ্ছুরিত শব্দমালা কেবল বিতর্কই উসকে দেয়নি; বরং আমাদের সমাজকাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা এক প্রাচীন দ্বান্দ্বিকতাকে নতুন করে উন্মোচিত করেছে।
অর্থনৈতিক কক্ষপথে নারীর শ্রম-সুরভি
বাংলার পলিমাটির ঘ্রাণ আর যান্ত্রিক নগরের কর্মচঞ্চলতায় আজ যে সমৃদ্ধির জয়ধ্বনি, তার প্রতিটি স্পন্দনে মিশে আছে নারীর রক্তবিন্দু ও স্বেদবিন্দুর নীরব ইতিহাস। যে নারী আজ নিজ শ্রমের সুধায় জাতীয় অর্থনীতির সৌধকে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে, তাকে যখন ‘নৈতিক অবক্ষয়’ কিংবা ‘শোষণের’ ধূসর তকমা পরিয়ে অবরোধবাসিনী করার পশ্চাৎপদ প্রয়াস চলে, তখন তা কেবল নারীর সত্তাকেই অপমান করে না—প্রগতির মেরুদণ্ডেই আঘাত হানে। আধুনিকতা এখানে কোনো বিজাতীয় বিলাস নয়; এটি নারীর স্বাবলম্বিতা ও আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার এক অগ্নিপরীক্ষা, যা তাকে স্বমহিমায় দীপ্ত করে তোলে।
আদর্শিক কুয়াশা ও ডিজিটাল ছদ্মবেশ
ভেরিফায়েড এক্স-হ্যান্ডেলের নীল পর্দার আড়াল থেকে যখন বিষাক্ত শব্দমালা জনমনে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, তখন ‘হ্যাকিং’-এর শীতল অজুহাতে সেই দহন প্রশমিত করার প্রচেষ্টা গভীর আস্থাসংকটকেই নগ্ন করে। ডিজিটাল প্রযুক্তির এই সন্ধিক্ষণে নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার এমন কৌশল কি আদৌ কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান দিতে পারে? সংশয় জাগে—এ কি কেবল যান্ত্রিক গোলযোগ, নাকি সুপ্ত মধ্যযুগীয় অন্ধকারের দীর্ঘলালিত কোনো ভাবাদর্শের অসচেতন বহিঃপ্রকাশ?
রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ও ভোটাধিকারের মরীচিকা
ভোটের রাজনীতির মোহে একদিকে নারীর দুয়ারে বিনয়ের সাথে আশীর্বাদ প্রার্থনা, অন্যদিকে সুযোগ বুঝে তাকেই নেতৃত্বের অনুপযুক্ত ঘোষণা—এই দ্বিমুখী আচরণ সমাজের এক গভীর ও পুরোনো ক্ষতকে উন্মুক্ত করে দেয়। তবে সময়ের জবাব দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে ঝাড়ু হাতে যে প্রতিবাদী দ্রোহ প্রত্যক্ষ হলো, তা কোনো ক্ষণিক আবেগ নয়; বরং প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ববাদের ভ্রান্ত দর্প চূর্ণ করার এক সাহসী ও শৈল্পিক উচ্চারণ—একটি স্পষ্ট ‘না’।
মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত: আধুনিকতা বনাম কূপমণ্ডূকতা
নীতি ও নৈতিকতার দোহাই দিয়ে নারীকে গৃহের নিভৃত অন্ধকারে আবদ্ধ রাখার প্রবণতা আদতে এক ধরনের বৌদ্ধিক শুচিবায়ুগ্রস্ততা। ধর্মগ্রন্থের উদার ও মানবিক চেতনাকে পাশ কাটিয়ে নারীকে প্রগতির প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যই প্রকাশ করে। একজন কর্মজীবী নারী কর্মক্ষেত্রে যে শুচিস্নিগ্ধতা ও তেজস্বিতা ধারণ করেন, তা অবরুদ্ধ পিঞ্জরের অন্ধকারে কল্পনা করাও অসম্ভব। নারীর মুক্তি ও স্বাধীনতাকে অশ্লীলতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা নিছকই বৌদ্ধিক দেউলিয়াত্ব।
ঐশী আলোকচ্ছটায় নারীর স্বর্গীয় মর্যাদা
“তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ”—এই কালজয়ী কুরআনিক ঘোষণা নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে ক্ষমতার সমীকরণে নয়, বরং মর্যাদার এক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। পোশাক যেমন সুরক্ষা ও সৌন্দর্যের প্রতীক, তেমনি এই ঐশী রূপক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মমতা ও সাম্যের চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। এই পবিত্র ভারসাম্য অস্বীকার করা মানেই সৃষ্টির নৈতিক বিন্যাসকে অস্বীকার করা।
পরিশেষ : মহাকালের শাশ্বত রায়
ঐতিহ্য ও প্রগতির দ্বন্দ্ব যেখানে তুঙ্গে, সেখানে অগ্রগতির একমাত্র পথ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার পূর্ণ স্বীকৃতি। রাজনীতির দাবার চাল যাই হোক, শাশ্বত সত্য এই—নারী তার যোগ্যতায় হিমালয়ের চূড়া স্পর্শ করেছে, মন্থন করেছে অতল মহাসমুদ্র। তাকে অবজ্ঞার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার কোনো প্রচেষ্টাই কালের স্রোতে টিকবে না। একটি উন্নত ও কালজয়ী রাষ্ট্র গঠনে আমাদের শব্দের প্রাসাদে বসে নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার সংকীর্ণ রাজনীতি পরিহার করতেই হবে। কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—যে জাতি নারীকে সম্মানের আসনে বসাতে জানে না, মহাকাল তাকে গৌরবের সিংহাসনে বসায় না।
Leave a Reply