
“৩ ইন ১: একই ক্ষমতার তিন মুখোশ”
কলমে: আশরাফুল আলম তাজ
উপক্রমণিকা: ক্ষমতা যখন আদর্শকে গ্রাস করে
রাজনীতি যখন আদর্শের উচ্চমার্গ ত্যাগ করে কৌশলগত আপসের চোরাবালিতে আত্মসমর্পণ করে, তখন রাষ্ট্র আর জনমতের দর্পণ থাকে না—রাষ্ট্র পরিণত হয় আত্মরক্ষায় উন্মত্ত এক দানবে। ইতিহাসের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে ক্ষমতা তার নগ্নতা আড়াল করতে বহুবিধ মুখোশ পরে জনতার সামনে হাজির হয়। সমকালীন রাজনৈতিক মানচিত্রে এলসিপি, জামায়াত ও বিদ্যমান রাষ্ট্রশক্তির ত্র্যহস্পর্শ তেমনই এক নির্মিত বাস্তবতা—যেখানে দৃশ্যত বিচ্ছিন্ন পথরেখা শেষ পর্যন্ত মিলিত হয় একই পরিণতির মোহনাতে।
এনসিপি: সম্ভাবনার অপমৃত্যু ও নিয়ন্ত্রিত ক্ষোভ
বিকল্প ব্যবস্থার এক মোহময় প্রতিশ্রুতি নিয়ে এলসিপির উত্থান ঘটেছিল। তাদের ভাষায় ছিল পুরোনো শিকল ভাঙার অঙ্গীকার, বক্তব্যে ছিল ক্ষমতার একচেটিয়াত্বে চিড় ধরানোর সাহস। কিন্তু সময়ের নির্মম অনুবর্তনে আজ স্পষ্ট—এলসিপির প্রতিবাদ ক্রমে হয়ে উঠেছে হিসেবি, ভাষা অলংকারে ভারী, আর অবস্থান সচেতনভাবে নিরাপদ। তারা ব্যবস্থার গায়ে আঁচড় কাটে, কিন্তু ভিত কাঁপায় না; প্রশ্ন তোলে উচ্চস্বরে, অথচ সিদ্ধান্তের টেবিলে নীরবতা তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভাষা। এই নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহ এলসিপিকে এমন এক রাজনৈতিক সত্তায় রূপ দিয়েছে, যা দৃশ্যত বিরোধী, কিন্তু কার্যত ক্ষমতার জন্য নির্বিঘ্ন। তারা ব্যবস্থার সেই সুরক্ষাকবচ—যা জনরোষের তাপ শুষে নিয়ে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখে।
জামায়াত: নিষিদ্ধের মোড়কে অপরিহার্য এক দাবার ঘুঁটি
এই ক্ষমতার ব্যাকরণে জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে রহস্যময় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক অনুষঙ্গ। ইতিহাসের দায়ভারে নুয়ে থেকেও তারা রাজনীতির কেন্দ্র থেকে কখনোই নির্বাসিত হয়নি। আদর্শিক অনুগামী, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক নেটওয়ার্ক—এই ত্রয়ী শক্তিকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে প্রয়োজনের মুহূর্তে। যখনই গণদাবি তুঙ্গে ওঠে, তখনই এই ‘ভয়ের প্রতিমূর্তি’ সামনে এনে রাষ্ট্র প্রগতিশীল বা মধ্যপন্থী সমাজকে সতর্ক করে দেয়। ফলে জামায়াত এখানে নিষিদ্ধ হয়েও অপরিহার্য, আইনের চোখে প্রান্তিক হয়েও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর। তারা এক স্থায়ী ভয়ের সংস্কৃতি—যার অস্তিত্ব দিয়েই রাষ্ট্র নিজের কর্তৃত্ববাদী অবস্থানকে বৈধতা দেয়।
রাষ্ট্র ও সরকার: অভিনয়ের একচ্ছত্র পরিচালক
এই দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সরকার—এক কুশলী নাট্যপরিচালক। রাষ্ট্র জানে, নিছক পেশিশক্তি দিয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকা যায় না; প্রয়োজন হয় বৈধতার অভিনয়। সেই অভিনয়ের জন্য চাই বিরোধী দল, চাই সংসদীয় বিতর্ক, চাই নিয়ন্ত্রিত বাকযুদ্ধ। এই রাষ্ট্রীয় ল্যাবরেটরিতে এলসিপি ও জামায়াত দুটি আলাদা রাসায়নিক উপাদান—যাদের বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় ‘স্থিতিশীলতা’ নামের এক কৃত্রিম গ্যাস। এলসিপির আঁতাতমূলক বিরোধিতা এবং জামায়াতের ভীতিপ্রদ উপস্থিতি মিলিয়ে যে রাজনৈতিক থিয়েটার নির্মিত হয়েছে, সেখানে জনগণ কেবল দর্শক—হাততালি বা হাহাকার দেওয়ার অধিকার আছে, চিত্রনাট্য বদলানোর নয়।
‘৩ ইন ১’ রাজনীতি: ক্ষমতার নিশ্চিদ্র দুর্গ
‘৩ ইন ১’ কেবল রাজনৈতিক বিদ্রূপ নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তার এক ভয়াবহ সত্য। তিনটি ভিন্ন মেরু পরোক্ষভাবে একটিই লক্ষ্য সাধন করে—ক্ষমতার কেন্দ্র যেন কখনো কোনো মৌলিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি না হয়। এখানে নির্বাচন ক্যালেন্ডারের আনুষ্ঠানিকতা, গণতন্ত্র সরকারি বিবৃতির অলংকার, আর মানুষ পরিণত হয় নিষ্প্রাণ পরিসংখ্যানে। স্বাধীনতার ভ্রমে বাঁচতে থাকা এক জনগোষ্ঠী আসলে বন্দি হয়ে পড়ে পরিকল্পিত রাজনীতির অদৃশ্য কারাগারে।
উত্তরণের ইশতেহার: শৃঙ্খল ভাঙার দর্শন
ইতিহাসের এই বন্দিশালা থেকে মুক্তির পথ কোনো আপসকামী সংস্কারে নেই, আছে এক আমূল ও বৈপ্লবিক রূপান্তরে। এই ‘ত্রয়ী অবয়ব’-এর বিপরীতে জনগণের মুক্তির ইশতেহার হতে হবে নিরেট সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বিনাশ:
রাজনীতির পিরামিডকে উল্টে দিতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু হবে তৃণমূলের মানুষ। রাষ্ট্র যখন ব্যক্তিকে দেবত্ব দেয়, তখনই স্বৈরতন্ত্রের জন্ম হয়। মুক্তির প্রথম শর্ত—ব্যক্তি নয়, সমষ্টির সার্বভৌমত্ব।
সরাসরি জবাবদিহিতা ও গণভোটাধিকার: পাঁচ বছর অন্তর ভোটের আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে মুক্তির স্বাদ পাওয়া সম্ভব নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ‘ফিরিয়ে আনার অধিকার’ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরাসরি ‘গণভোট’ প্রবর্তন করতে হবে। তবেই নাট্যপরিচালকের স্ক্রিপ্ট ছিঁড়ে জনগণের সংলাপ প্রতিষ্ঠিত হবে।
ভয়ের সংস্কৃতির অবসান ও নিঃশর্ত নাগরিক সুরক্ষা:
যখন রাষ্ট্র কোনো পক্ষকে ‘জুুুুুজু’ হিসেবে দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে, তখন বুঝতে হবে নাগরিকের বিচারবুদ্ধি হরণ করা হচ্ছে। আইন ও বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে এমন এক অভয় অরণ্য তৈরি করতে হবে, যেখানে নাগরিকের মুক্তি হবে ভীতিহীন এবং মর্যাদা হবে নিঃশর্ত।
অর্থনৈতিক শোষণের কাঠামোগত বিলোপ:
রাজনৈতিক প্রহসন মূলত অর্থনৈতিক লুণ্ঠনেরই এক সুশোভিত আবরণ। সুবিধাভোগী পুঁজিতন্ত্রের বিনাশ ঘটিয়ে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র কেবল গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর পাহারাদার হবে না, বরং সাধারণ মানুষের অন্নের গ্যারান্টি দেবে।
উপসংহার: এক অনিবার্য প্রশ্ন
ইতিহাস বারবার সতর্ক করে—যে রাষ্ট্র কৃত্রিম বিরোধিতার চাদরে নিজেকে ঢেকে রাখে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত প্রকৃত জনবিস্ফোরণের মুখে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। আজ যাকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বলে চালানো হচ্ছে, আগামী দিনে সেটিই হয়ে উঠতে পারে রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়াবহ দায়পত্র।
প্রশ্নটি তাই এড়িয়ে যাওয়ার নয়: এই রাজনীতি কি শোষিতের মুক্তির ইশতেহার, নাকি ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার এক পরিশীলিত ষড়যন্ত্র? সময় যখন রায় দেবে, তখন একে কি প্রতিরোধের মহাকাব্য বলা হবে—নাকি নিঃশব্দ আত্মসমর্পণের এক কালো দলিল? মুক্তির সূর্য কেবল তখনই উদিত হবে, যখন জনগণ এই পরিকল্পিত অভিনয়ের মঞ্চ ভেঙে নিজেদের ভাগ্যলিপি নিজেরাই লিখবে।
Leave a Reply