
হরমুজ়ের অস্থিরতা ও বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ
আশরাফুল আলম তাজ
কলামিস্ট ও সমসাময়িক বিশ্লেষক
উপক্রমণিকা
একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি আজ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে এক সংকীর্ণ জলপথের কিনারায়। হরমুজ প্রণালী—মাত্র ৩৩ কিলোমিটার বিস্তৃত এই জলরেখা—আজ কেবল পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির ‘নিশ্বাস’ ও ‘প্রশ্বাস’ নিয়ন্ত্রণকারী এক মহাধমনী। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ যখন সরাসরি সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে, তখন প্রতিটি উত্তেজনার ঢেউ প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রতিটি বন্দরের নোঙর কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির ‘কণ্ঠনালী’
ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল জলপথ। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) এক-তৃতীয়াংশ এই ক্ষুদ্র পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি কার্যত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের এক দুর্ভেদ্য ‘বটলনেক’।
ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৮০-র দশকের ‘ট্যাঙ্কার ওয়ার’ থেকে আজকের ড্রোন হামলা—প্রতিবারই এই পথ রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের পারদ আকাশচুম্বী হয়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক ‘নৌ-মাইন’ পাতা বা হরমুজ অবরুদ্ধ করার হুমকি কেবল সামরিক আস্ফালন নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘এনার্জি ব্ল্যাকমেইল’, যা বিশ্বশক্তির ভারসাম্যকে তছনছ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
পাঁচ দিনের বিরতি’: কৌশল না কি ঝড়ের পূর্বাভাস?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ৪৮ ঘণ্টার চরম সময়সীমার পর হঠাৎ ‘পাঁচ দিনের’ সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এটি কি প্রকৃতই কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ, না কি পেন্টাগনের গোপন ‘অপারেশন খার্গ’ বা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় সময় গ্রহণ? তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলার থেকে ৯৬ ডলারে নেমে আসা সাময়িক স্বস্তি দিলেও, নেপথ্যে ৫ হাজার মার্কিন সেনার মুভমেন্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে—এই শান্তি হয়তো এক বিধ্বংসী ঝড়ের পূর্বলক্ষণ।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: জ্বালানি সংকট ও অস্তিত্বের লড়াই
বিশ্বের এই অগ্নিকাণ্ডের উত্তাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানিনির্ভর, যার একটি বিশাল অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
সংকটের কারণ: হরমুজ প্রণালী সংকটের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এছাড়া, এলএনজি (LNG) সরবরাহ বিঘ্নিত হলে শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাত স্থবির হওয়ার উপক্রম হয়।
উত্তরণের সম্ভাবনা ও রণকৌশল: এই সংকট থেকে বাঁচতে বাংলাদেশকে ত্রি-মুখী কৌশল গ্রহণ করতে হবে: উৎস বৈচিত্র্যকরণ: কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে রাশিয়ার সাথে দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি চুক্তি এবং গভীর সমুদ্রে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা।
কৌশলগত মজুত (Strategic Reserve): ভারতের মতো বাংলাদেশেও মাটির নিচে বিশাল তেলের ভাণ্ডার বা স্টোরেজ সুবিধা গড়ে তোলা, যা অন্তত তিন মাসের জরুরি চাহিদা মেটাতে পারবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি: আমদানিনির্ভরতা কমাতে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো টেকসই জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
ভারতের ‘কৌশলগত বর্ম’ ও আঞ্চলিক প্রভাব
ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ (SPR) এবং রাশিয়ার সাথে ‘রুপি-রুবল’ লেনদেনের কূটনীতি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক শিক্ষণীয় অধ্যায়। ভারত যেভাবে রাশিয়ার তেলকে ‘কৌশলগত কুশন’ হিসেবে ব্যবহার করছে, তা আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
উপসংহার: ভারসাম্যের কূটনীতি ও আগামীর পথ
বর্তমান সংকট বিশ্ব রাজনীতির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এক কঠোর বার্তা। এই অগ্নিগর্ভ বাস্তবতায় বাংলাদেশ বা ভারতের মতো দেশগুলো আজ কেবল তেলের ক্রেতা নয়; বরং তারা একেকজন কৌশলী নাবিক।
সমাপ্তি ভাবনা
পারস্যের এই উত্তাল তরঙ্গে যারা কেবল তেলের ব্যারেল গোনে, তারা পরাজিত হবে। জয়ী হবে তারাই, যারা ভূ-রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর দূরদর্শী পরিকল্পনার পাল তুলে ঝড়ের মাঝেও নিজেদের অস্তিত্বের প্রদীপটি প্রজ্বলিত রাখতে পারবে।
Leave a Reply