
মানবজীবনে সফলতার গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো “আবেগ ও বিবেক”
– আল্লামা হানিফ নূরী পীর সাহেব
শুধু আবেগ নয় – বিবেক দিয়ে আবেগকে কন্ট্রোল করে মানবজীবনকে সফল করা প্রতিটি মানুষের জন্য একান্ত চিরস্থায়ী সুখ-শান্তির বিষয়।
বিষয়টি উদাহরণের মাঝ্যমে শুরু করছি, রেলগাড়ি চলে লোহার দুটি পাতের উপর আর তা হলো রেললাইন।
রেললাইনের লোহার পাত দুটি সমান দুরত্বে না থাকলে বা একটি আরেকটির সাথে মিশে গেলে নিশ্চিতই রেলগাড়ি দূর্ঘটনায় পতিত হবে।
তেমনি বিবেক ও আবেগ একত্রিত হয়ে গেলে কিংবা শুধু আবেগ দিয়ে কর্ম নিয়ন্ত্রিত হলে জীবনে দূর্ঘটনা ঘটতে থাকবে এবং এই চলতে থাকা দূর্ঘটনা বয়ে চলবে মৃত্যু পর্যন্ত।
বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে হয় বিবেক দিয়ে। আবেগের দ্বারা বিচার করলে ভুলের জালে আটকিয়ে গিয়ে সেখানেই আবর্তিত হতে থাকে এবং বের হওয়ার আর পথ থাকে না।
জীবনের বড় একটি ঘটনা বয়ঃসন্ধির পর বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হওয়া। যৌনতা এই আকর্ষনকে দূর্বার করে তুলে।
অর্থাৎ প্রত্যেকে সন্তুষ্টি অর্জন এবং আত্মতৃপ্তির সহিত ভাল লাগাকে পেতে চায় অন্যের দ্বারা। আর যৌনতার দূর্বার আকর্ষনকেই যারা শুধু প্রাধান্য দেয়, এটা তাদের অসার রুচীর পরিচায়তা।
মানুষ ভালবেসে এবং আবেগে আকৃষ্ট হয়ে বিয়ে করে। কিন্তু সংসার বা নতুন জীবন শুরু করতে গেলে, আবেগ ও বিবেক আলাদা ভাবে প্রয়োগ করতে হয়। এই দুই খেলোয়াড়কে দুই ভিন্ন পাত্রে রেখে জীবন চালিয়ে নিতে হয় যা দুনিয়ার বেশীর ভাগ ছেলে-মেয়েরা ব্যর্থ হয় এই হিসেব কষতে।
ফলে সংসারে চলে উচ্ছৃঙ্খলতা, ঝগড়া, হাতাহাতি, মারামারি এবং সব শেষে তিক্ততার সহিত ছাড়াছাড়ি। আবেগ ও বিবেককে এক করে ফেললে এমনটি হওয়া স্বাভাবিক।
যে মানুষটিকে ভালবাসতে হয় তাকে নিজ শরীরের অঙ্গ মনে করতে হবে নয়ত দূর্ঘটনা চলতেই থাকবে।
ভালবাসার মানুষটিকে যখন নিজ চাওয়া-পাওয়ার সীমানার গণ্ডির ভিতর বেঁধে রাখতে চায় তখন সেই ভালবাসা পরিণত হয় “দাসত্ব”-এ।
বল প্রয়োগের মাধ্যমে নিজ প্রয়োজন আদায় করতে চাইলে হাঙ্গামার সহিত দাসত্বের উপস্থিতি। আবেগ ও বিবেককে আলাদা করার জ্ঞান অর্জন না করে নতুন জীবন একসাথে শুরু করা নির্বুদ্ধিতা এবং শুরুতেই গলদ।
স্বামী-স্ত্রীর “বিরক্তি”, “সত্যবাদিতা” “সহনশীলতা”-র
মাত্রাকে বিয়ের আগেই ভাল করে জেনে নিতে হয়। এই সম্পর্কে জ্ঞান পূর্ণতা না হলে, সেই দাম্পত্য জীবন টিকে না আর টিকলেও সারাজীবন উচ্ছৃঙ্খলতা, অস্থিরতা, অশান্তি লেগেই থাকে। প্রায় সকলেই এই ভুলটি করে থাকে।
ক্ষেত্র বিশেষে “আবেগ” অন্তরে কখনও ভাল লাগা এবং প্রশান্তির দরজা খোলে ভিতরে প্রবেশ করে আবার কখনও বোমা ! যার কোন বিচার করার ক্ষমতা নাই এবং যেখানে খুশী সেখানে বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহা প্রলয় ঘটিয়ে দেয়।
তাই খেয়ালের সহিত বিবেককে আবেগের নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে দণ্ডায়মান করে রাখতে হয়।
ধর্ম বিষয়ে যখন আবেগ ও বিবেক উত্থাপিত হয়, তখন খুব সচেতন ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় নয়ত নিজের অজান্তেই নিজেকে ধ্বংসের জগতে প্রবেশ করানো হয়।
আবেগ ও বিবেকের সংমিশ্রণ এবং পার্থক্যের জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক ধার্মিকের জন্য বাধ্যতামূলক।
আবেগ ও বিবেক—উভয়ই মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকের অংশ হলেও ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনে এগুলোর গুরুত্ব ও ভূমিকা ভিন্ন।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ দুটির গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো:
১. বিবেকের ধর্মীয় গুরুত্ব (Conscience):
সত্য-মিথ্যা যাচাই: বিবেক হলো মানুষের ভেতরের সেই আলো, যা ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করে। ইসলাম বা অন্যান্য ধর্মে একে ‘কলব’ বা আত্মার শুদ্ধতম অংশ হিসেবে দেখা হয়, যা সঠিক পথের নির্দেশ দেয়।
পাপবোধ ও অনুশোচনা: যখন কোনো ভুল কাজ হয়, বিবেক তখন দংশন করে বা অপরাধবোধ জাগিয়ে তোলে। এই অনুশোচনাই মানুষকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে এবং ভবিষ্যতে ভালো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
পবিত্রতা:
বিবেকবান মানুষ সাধারণত ন্যায়পরায়ণ হয়, যা ধর্মের একটি প্রধান লক্ষ্য। বিবেক মানুষকে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মানুষের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শনে পরিচালিত করে।
ধর্মের আয়না:
বিবেককে ধর্মের আয়না বলা হয়, কারণ এটি ছাড়া ধর্মপালন যান্ত্রিক হয়ে পড়ে এবং মানুষ পথভ্রষ্ট হতে পারে।
২. আবেগের ধর্মীয় গুরুত্ব (Emotion):
ভালোবাসা ও ভক্তি:
স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা, ভয়, আশা এবং ইবাদতের প্রতি অনুরাগ হলো ইতিবাচক আবেগ। এটি ঈমানের ভিত্তি।
অনুকম্পা:
মানুষের প্রতি দয়া, সহানুভূতি ও ভালোবাসাও ধর্মীয় আবেগের অংশ, যা সমাজকে সুশৃঙ্খল রাখে।
বিপজ্জনক দিক:
বিবেক-বুদ্ধি বর্জিত আবেগ অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। অনেক সময় অতি আবেগপ্রবণ হয়ে মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয় বা অন্যের প্রতি অন্যায় করে বসে, যা ধর্মের মূল শিক্ষার পরিপন্থী।
আবেগ ও বিবেকের সম্পর্ক:
ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে, আবেগের ওপর বিবেকের প্রাধান্য থাকা আবশ্যক। আবেগ হলো আত্মার বহিঃপ্রকাশ, আর বিবেক হলো সেই আবেগের শুদ্ধতম রূপ।
যেখানে ধর্ম আছে, সেখানে বিবেক থাকে, আর যেখানে বিবেক আছে সেখানেই প্রকৃত ধর্ম পালিত হয়।
পরিশেষে বলতে চাই
ধর্ম পালনে আবেগ প্রয়োজন, তবে তা যেন বিবেক বা জ্ঞান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। বিবেক ছাড়া আবেগ অন্ধ, আর আবেগ ছাড়া বিবেক শুষ্ক। তাই বিবেক বা জ্ঞান অনুযায়ী আবেগ নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৃত ধর্মীয় চর্চা।
———আধ্যাত্মিক গবেষক ও লেখক
শাহসুফি আল্লামা হানিফ নূরী পীরসাহেব,
নূরে হক দরবার শরীফ,
মহাসচিবঃ
আশিক্কীনে আউলিয়া ঐক্য পরিষদ বাংলাদেশ।
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানঃ
হযরত লাডুমশাহ (রঃ) আধ্যাত্মিক গবেষনা কেন্দ্র।
সন্মানীত উপদেষ্টাঃ জাতীয় দৈনিক “ঐশি বাংলা” পত্রিকা।
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষঃ সানফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজ।
Leave a Reply