
মাজার সংস্কৃতিতে আঘাত: কোন পথে যাচ্ছে আমাদের সহনশীলতা? – কাইয়ুম সরকার
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার মিরপুরের হযরত শাহ আলী বোগদাদী (র.)-এর মাজারসহ দেশের বেশ কয়েকটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে শঙ্কিত করেছে। যে সমাজ শত শত বছর ধরে সুফি-সাধকদের উদার নৈতিকতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে বিকশিত হয়েছে, সেখানে হঠাৎ এই ধরনের সহিংসতা কোনো সাধারণ বিশৃঙ্খলা নয়; বরং এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিমূলে এক বড় ধরনের আঘাত।
হযরত শাহ আলী (র.)-এর মাজার কেবল কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর উপাসনালয় নয়। এটি ঢাকার অন্যতম প্রাচীন এক ঐতিহাসিক স্মারক এবং সব ধর্মের, সব শ্রেণির মানুষের এক পরম আশ্রয়স্থল। সুফিবাদের মূল বাণীই হলো মানবপ্রেম, অহিংসা ও স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এই সুফি ধারার হাত ধরেই এ দেশের বুকে ইসলামের উদার ও মানবিক বাণী ছড়িয়ে পড়েছিল। আজ যখন সেই মাজারগুলোর ওপর হামলা চালানো হয়, তখন তা কেবল ইটের দেয়াল ভাঙা নয়, তা মূলত বাঙালির হাজার বছরের সম্প্রীতির ইতিহাসকে চূর্ণ করার এক অপচেষ্টা।
কোনো একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও বিশ্বাসের মানুষ থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কারো যদি কোনো বিশেষ আচার বা বিশ্বাসের সাথে দ্বিমত থাকে, তবে তা নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক হতে পারে, আলোচনা হতে পারে। কিন্তু কোনো মতেই লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করা, ভাঙচুর করা বা অগ্নিসংযোগ করা কোনো সুস্থ ও সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। পবিত্র ইসলাম ধর্ম কোনোভাবেই অন্যের উপাসনালয় বা ধর্মীয় স্থানে আঘাত করা সমর্থন করে না। ফলে, যারা ইসলামের দোহাই দিয়ে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হচ্ছে, তারা প্রকৃতপক্ষে ধর্মের কোনো কল্যাণ করছে না; বরং ধর্মকে এক ধরনের উগ্রতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এই মাজার সংস্কৃতি কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের লোক-ঐতিহ্য, গান, সুফি দর্শন এবং প্রান্তিক মানুষের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি। বহু বাউল, সাধক ও সাধারণ মানুষ এই স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে তাদের জীবন ও সংস্কৃতির চর্চা করেন। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এই ঐতিহ্যগুলোকে ধ্বংস করার অধিকার কারো নেই।
আমরা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন এবং মানবিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু মনের ভেতর উগ্রতা আর হিংসা পুষে রেখে কখনো একটি উন্নত সমাজ গঠন সম্ভব নয়। শাহ আলীর মাজারসহ দেশের অন্যান্য মাজারে যারা এই ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে, তাদের অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
একই সাথে, সমাজের সচেতন নাগরিক, সুফীদের এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের এক হয়ে এই উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বাসের বৈচিত্র্যই এ দেশের সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্যকে রক্ষা করতে না পারলে, আমরা আমাদের আত্মপরিচয়ই হারিয়ে ফেলব। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন—অনতিবিলম্বে দেশের সকল মাজার ও ধর্মীয় ঐতিহাসিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং সম্প্রীতির এই বাংলায় যেকোনো মূল্যে পরমতসহিষ্ণুতার পরিবেশ বজায় রাখা হোক।
কাইয়ুম সরকার
আইন শিক্ষার্থী ও সূফী গবেষক
বিভাগীয় সম্পাদক, আমাদের শিশুমেলা
Leave a Reply