
আলোকিত অন্তরের প্রত্যাশায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লিখা
– আল্লামা হানিফ নূরী পীর সাহেব
১. সত্যবাদিতা
সত্য কথা বলা, সত্যের সঙ্গে থাকা এবং মিথ্যার পরিবর্তে সত্যকে গ্রহণ করাই সত্যবাদিতা।
সত্য মানুষকে মুক্তি প্রদান করে, পক্ষান্তরে মিথ্যা বিভ্রান্তিসহ নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে।
সত্যবাদিতা কেবল একজন মানুষের ধর্মীয় জীবনের ক্ষেত্রে নয়, ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক পরিমণ্ডল, সামাজিক পরিণ্ডল; এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।
সত্যবাদিতা কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, জাগতিক যেকোনো মানদণ্ডের বিচারে এটি একটি ভালো গুণ।
সত্যবাদী মানুষকে সবাই ভালোবাসে, চাই তিনি মুসলমান হোন কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বী। কালো হোন কিংবা সাদা। হোন তিনি উঁচু বংশীয় কিংবা সাধারণ কোনো বংশের সদস্য।
আলোকিত একজন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা প্রথম ও প্রধান গুণ হিসেবে বিবেচিত।
পবিত্র কোরআনে সত্য কথা বলা, সত্যের পক্ষে অবস্থান করা এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হওয়ার ব্যাপারে অসংখ্য নির্দেশ এসেছে।
আল্লাহ মহান পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে যেসব ভালো গুণাবলিকে আয়ত্ত করতে জোর নির্দেশ প্রদান করেছেন, তার মধ্যে প্রথম সারির গুণ হলো ‘সত্যবাদিতা’।
সত্যবাদিতাকে তুচ্ছ করে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন- এমন ইতিহাস পৃথিবীতে আগে ছিল না, বর্তমানে নেই এবং ভবিষ্যতেও সৃষ্টি হবে না; হতে পারে না।
কারণ সত্য সব ভালো স্বভাব বা সব শুভ্রতার ‘মা’।
জয় পাঁক-পান্জাতন, জয় নূরীতন।
২. ধর্মান্ধরা ধর্ম শেখায় ? সাধারণ মানুষ যাবে কোথায় ?
ধর্মান্ধতা বা অন্ধবিশ্বাস যখন ধর্মের মূল বাণী (মানবতা, শান্তি, সহনশীলতা) ছাপিয়ে যায়, তখন তা সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে বা কী করবে, তা নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ:
বিবেক ও জ্ঞানচর্চা:
অন্ধভাবে কারো কথায় বিশ্বাস না করে, নিজস্ব বিবেক, বুদ্ধি এবং প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ধর্মের সঠিক বাণী বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
মানবিক মূল্যবোধ:
যে ধর্ম মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায়, তা থেকে দূরে থেকে ‘সবার উপর মানুষ সত্য’—এই নীতিতে বিশ্বাস স্থাপন করা।
সচেতনতা:
ধর্মান্ধ বা উগ্রপন্থী মতবাদ সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে প্রতিহত করা।
প্রকৃতি ও অস্তিত্ব অনুভব:
ধর্ম শুধু মসজিদ-মন্দিরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা নিজের প্রকৃতি ও অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত—এই বোধ ধারণ করা।
ধর্মান্ধরা যখন ধর্ম শেখায়, তখন সাধারণ মানুষের দায়িত্ব হলো—বিভ্রান্ত না হয়ে মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক পথে চলা।
জয় পাঁক-পান্জাতন, জয় নূরীতন।
৩. প্রজ্ঞা ও বিবেক
জ্ঞান হচ্ছে কোন বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে সম্যক ধারণা করার মত বোধশক্তি কিংবা অভিজ্ঞতাই হচ্ছে জ্ঞান। আর প্রজ্ঞা হচ্ছে জ্ঞানকে হৃদয়াঙ্গম করে কর্মের মাধ্যমে বাস্তবে প্রয়োগ করার শক্তি।
অন্যভাবে প্রজ্ঞা হচ্ছে উৎকৃষ্ট জ্ঞান যা অন্তরে কর্ষিত ও চর্চিত হয়েছে এবং বাস্তবতায় কর্ম দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার দ্বারা কল্যাণ সাধিত হয়েছে।
পুঁথিগত বিদ্যা প্রজ্ঞা নয় আর প্রজ্ঞার সাথে অন্তরের সম্পর্ক গভীর। জ্ঞানী চোর, বাটপাররাও হতে পারে কিন্তু প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি কর্মে উত্তম, চিন্তায় সৎ।
আরেক শ্রেণী ক্ষমতাধর উত্তম ও সততার ভান করে প্রজ্ঞার পরিচয়ে রাজনীতি ও ক্ষমতা ব্যবহার করে শান্তিকামী ও মীমাংসাকারী বলে দুনিয়ায় নিজেদের জাহির করে। এরা কুটিল অন্তরধারী ধুরন্ধর এবং জগতের সবচেয়ে বিপদজনক।
প্রজ্ঞার মর্যাদার স্তর রয়েছে। উত্তম প্রজ্ঞার একটি হচ্ছে স্থান ও সময়ের সাপেক্ষে অন্যের অন্তরের অনুভূতি ও অবস্থান বুঝতে পারার ক্ষমতা। সত্যকে হৃদয়াঙ্গম এবং অন্ধবিশ্বাসের শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইলে প্রজ্ঞার বিকল্প নেই।
“অন্তদৃষ্টি” প্রজ্ঞার হাতিয়ার। বর্তমান জমানার মানুষজন অন্তদৃষ্টিকে মূল্যহীন ও জীবনের বিড়ম্বনা মনে করে এবং আবর্জনা মনে করে ছুড়ে ফেলে।
ইহা নির্বোধদের কর্ম। অন্তদৃষ্টি ব্যতীত দাম্পত্য জীবন, পারিবারিক জীবন হয় অস্থির এবং সম্পর্ক হয় ভঙ্গুর, ঝগড়া সর্বদা লেগেই থাকে,
রাগ সংবরণ হয় কঠিন। কমবেশী সকলকে প্রজ্ঞার অধিকারী হতে হয় নয়ত মানুষ আর ইতর জীবদের মধ্যে পার্থক্য থাকে না। নিজ সত্তাকে নিজে অপমানিত করা।
জীবন সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় করে পরিচালিত করার জন্য সঠিক জ্ঞান ও ভুল জ্ঞান পার্থক্য করতে পারা এবং জ্ঞানের রাজ্যে সঠিকটি প্রবেশ করতে দেওয়া আর ভুলটিকে প্রতিরোধ করার পুরো প্রক্রিয়াকে কার্যকরী রাখার জন্য এক “প্রহরী” জন্মগত ভাবে মানব জাতির প্রত্যেকের ভিতরে স্থাপিত করে দেয়া হয়েছে।
সেই প্রহরী হচ্ছে “বিবেক”। মহাবিশ্বের এক মহা মূল্যবান এই “বিবেক”। শুধু যুক্তি দিয়ে যারা জীবন, বাস্তবতা ও চার পাশের জগতকে বিচার করার প্রয়াস চালায় তাদের যেমন বিবেকের অভাব আছে তেমনি অন্ধভাবে ধর্মকে যারা আঁকড়ে ধরে আছে, তারাও একই।
আর ইসলামের অনুসারীদের অনেকে শুধু বিবেক বা কমন সেন্সই নয়, সাথে নিজেদের মগজও হারিয়ে ফেলেছে। সুস্থ চিন্তা করা ও বুঝার প্রসেস তা তাদের মগজ থেকে উধাও।
মোহাম্মদ(সা)-র শিক্ষা কী এবং দুনিয়ার উদ্দেশ্যে কী রেখে গেছেন?- তা তাদের জ্ঞানে নাই। তারা অসুর !
দুঃখজনক !
সভ্য দুনিয়ার শান্তিময়তার জন্য উগ্রতা বন্ধ হওয়া জরুরী।
আধ্যাত্মিক গবেষক ও লেখক
শাহসুফি আল্লামা হানিফ নূরী পীরসাহেব,
নূরে হক দরবার শরীফ,
মহাসচিবঃ আশিক্কীনে আউলিয়া ঐক্য পরিষদ বাংলাদেশ।
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানঃ হযরত লাডুমশাহ (রঃ) আধ্যাত্মিক গবেষনা কেন্দ্র।
সন্মানীত উপদেষ্টাঃ জাতীয় দৈনিক
“ঐশি বাংলা” পত্রিকা।
Leave a Reply