
বাউল সূফী সাধক আব্দুর রশিদ সরকার রহমতুল্লাহি আলাইহি (১৯৫৩–২০০৯)
-মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী
ভূমিকা
ধল্লেশ্বরী, কালীগঙ্গা ও পদ্মা—এই তিন নদীর স্রোতধারা যেমন মানিকগঞ্জের জনপদকে গড়ে তুলেছে, তেমনি এই নদীবিধৌত ভূগোলের ভেতরেই জন্ম নিয়েছিল এক সাধক-জীবনের দীর্ঘ সাধনা, গান, প্রেম ও দরবার-প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। সিংগাইর থানার অন্তর্গত আজিমপুর গ্রামে ১৯৫৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার জন্মগ্রহণ করেন পাক পাঞ্জাতন আহলে বায়তের প্রেমিক সূফী বাউল সাধক আব্দুর রশিদ সরকার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ২০০৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাত ১০টায় তিনি ওফাত গ্রহণ করেন।
১) শিকড় ও বংশপরিচয়: আজিমপুরের পরিবার, স্মৃতি ও উত্তরাধিকার
আব্দুর রশিদ সরকারের পিতা ছিলেন আইনুদ্দিন পত্তনদার, মাতা রূপজান বিবি। দাদা আহাদী পত্তনদার এবং নানা হযরত আলী মাদবর—এই চারজনের নামেই তাঁর পারিবারিক শেকড়ের একটি পরিষ্কার রেখা টানা যায়। গ্রামীণ বাংলার সাধক-জীবনে পরিবার শুধু জন্মের ঠিকানা নয়; পরিবারই হয়ে ওঠে স্মৃতির প্রথম দরবার, নৈতিকতার প্রথম পাঠশালা, আর সমাজ-সম্পর্কের প্রথম ভুবন।
আজিমপুর—ধল্লেশ্বরী-কালীগঙ্গা-পদ্মা বিধৌত এই এলাকার মানুষ নদীর মতোই চলমান: কখনও জীবিকার খোঁজে, কখনও হাট-মেলা, কখনও গানের আসর, কখনও দরবারের মাহফিলে। এমন প্রেক্ষাপটে আব্দুর রশিদ সরকারের বেড়ে ওঠা মানে একদিকে গ্রামীণ জীবনযাত্রার কঠোর বাস্তবতা, অন্যদিকে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ধারার গভীর অনুরণন—দুইয়ের মাঝখানে একটি জীবন গড়ে ওঠা।
২) গান থেকে সাধনা: “বিচার গান” শেখার পর্ব
তিনি গানের ওস্তাদ আনোয়ার দেওয়ানের কাছে “বিচার গান”-এ শিক্ষা গ্রহণ করেন। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে বিচার গান কেবল বিনোদন নয়—এটি অনেক জায়গায় ন্যায়-অন্যায়, সমাজনীতি, ধর্মীয় বোধ, আধ্যাত্মিক শিক্ষা—এসবের বয়ান হয়ে ওঠে। বিচার গানের আসরে প্রশ্ন থাকে, যুক্তি থাকে, বয়ান থাকে; কখনও এটি জারি-সারি বা বাউলধারার সঙ্গেও মিশে যায়।
এই শিক্ষাগ্রহণের ঘটনাটি তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এখানেই তিনি কণ্ঠকে শুধু সুরে নয়, বক্তব্যে ও বোধে শানিত করেন। সাধক-জীবনে “বাণী” যেমন দরকার, তেমনি দরকার সেই বাণীকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কৌশল—গান সেই কৌশলকে প্রাণ দেয়।
৩) বৈরাবর দরবার শরিফে শিষ্যত্ব: পীরের হাতে আত্ম-গঠনের অধ্যায়
আব্দুর রশিদ সরকার বৈরাবর দরবার শরিফের পীর কেবলা “আউলাদে রাসূল গোলাম মওলা রেজভী ” ওরুফে তূলা চাঁন বাবার কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। গ্রামীণ সূফী-দরবার সংস্কৃতিতে শিষ্যত্ব মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি জীবন-শৃঙ্খলার ভেতর প্রবেশ। শিষ্যত্বের মাধ্যমে শিষ্য নিজের অহংকে সংযত করে, আদব-কায়দা শেখে, জিকির-সাধনার রীতি আয়ত্ত করে, এবং মানুষের সেবাকে ইবাদতের রূপ দিতে শেখে।
এখানে “আউলাদে রাসূল” শব্দবন্ধটি স্থানীয় দরবার-সংস্কৃতিতে বড় অর্থ বহন করে—এটি নবীপ্রেম, আহলে বায়তের মহব্বত, এবং সেই মহব্বতকে জীবনাচরণে রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতির ভাষা। আব্দুর রশিদ সরকারের পরিচয়ের কেন্দ্রে তাই “পাক পাঞ্জাতন আহলে বায়তের প্রেমিক” কথাটি শুধু বিশেষণ নয়; এটি তাঁর আধ্যাত্মিক পরিচয়ের মর্মবাক্য।
৪) খেলাফত প্রাপ্তি ও দায়িত্ব: দরবার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ
পরবর্তীতে তিনি খেলাফত প্রাপ্ত হন এবং পীরের আদেশক্রমে আজিমপুর গ্রামে “ফকির মওলা দরবার শরিফ” প্রতিষ্ঠা করেন। খেলাফত প্রাপ্তি মানে—শুধু সম্মান নয়, বরং দায়িত্ব: মানুষের দিকে তাকিয়ে পথ দেখানোর দায়িত্ব, আদব শেখানোর দায়িত্ব, মিলাদ-মাহফিল/জিকির-আসকারের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব, আর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—নিজের ভেতরে বিনয়কে অক্ষুণ্ণ রাখা।
দরবার প্রতিষ্ঠা সাধারণত কয়েকটি স্তরে গড়ে ওঠে—
ব্যক্তিগত সাধনা ও আধ্যাত্মিক গ্রহণযোগ্যতা (লোকেরা “সাহেব”কে মানে)
স্থানীয় সামাজিক নেটওয়ার্ক (গ্রাম-পরিবার-শিষ্য-অনুরাগী)
বার্ষিক ও নিয়মিত অনুষ্ঠান (ওফাত দিবস, উরস/মেলা, জিকির, মিলাদ)
দরবারের নৈতিক ভূমিকা (ঝগড়া-সংঘাত মিটানো, অসহায়কে সহায়তা, উপদেশ)
ফকির মওলা দরবার শরিফ প্রতিষ্ঠা তাই শুধু একটি স্থাপনা নয়—এটি আজিমপুর গ্রামের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি নতুন কেন্দ্র গড়ে তোলার ইতিহাস।
৫) সাধক আব্দুর রশিদ সরকার: “সূফী বাউল” পরিচয়ের অর্থ
“সূফী বাউল সাধক”—এই পরিচয়ে দুইটি ধারার মিল দেখা যায়:
সূফীবাদ: প্রেম, জিকির, আদব, পীর-শিষ্য সম্পর্ক, আত্মশুদ্ধি
বাউলধারা: অন্তরসাধনা, গান-বাণী, লোকভাষায় গভীর তত্ত্ব, মানবপ্রেম
গ্রামীণ বাংলায় বহু সাধকই এই দুই ধারাকে আলাদা করে দেখেন না—বরং জীবনকে শুদ্ধ করা, মানুষকে ভালোবাসা, আর আল্লাহ-রাসূল ও আহলে বায়তের মহব্বত—এসবকে এক স্রোতে মিলিয়ে দেন। আব্দুর রশিদ সরকারও সেই স্রোতের একজন প্রতিনিধি—যার জীবনগাথা নদীর মতোই: বহমান, মানুষের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছানো, আর শেষতক স্মৃতিতে মিশে থাকা।
৬) ওফাত: সময় ও স্মৃতির নির্দিষ্ট ঠিকানা
তিনি ওফাত গ্রহণ করেন ২০০৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাত ১০টায়। এই তারিখটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ (ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির দিন)। ফলে গ্রামীণ দরবার-সংস্কৃতিতে এই দিনটি তাঁর স্মরণকে আরও আবেগঘন করে তুলতে পারে—একদিকে জাতির স্মৃতি, অন্যদিকে দরবারের স্মৃতি।
তাঁর ওফাতের পরও আজিমপুরে ফকির মওলা দরবার শরিফে প্রতি বছর তাঁর ওফাত দিবসে সাধুর মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে—এটি প্রমাণ করে যে তিনি কেবল ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি একটি ধারার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলেন। সাধুর মেলা সাধারণত গান, জিকির, মিলাদ/দোয়া, শিষ্য-ভক্তদের মিলন, এবং গ্রামীণ সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্র তৈরি করে—যেখানে ধর্মীয় অনুভূতি ও লোকসংস্কৃতি একসাথে হাঁটে।
৭) আজকের মেলা: বেঁচে থাকা উত্তরাধিকার
আজ ২১ ফেব্রুয়ারি—আব্দুর রশিদ সরকারের ওফাত দিবসে—ফকির মওলা দরবার শরিফে প্রতি বছরের ন্যায় সাধুর মেলা হচ্ছে ২ দিন ব্যাপী । এই “প্রতি বছরের ন্যায়” বাক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ: এটি ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য। সাধকদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় গবেষণার বিষয় হলো—তাঁর অনুপস্থিতিতেও তাঁর ধারাটি কীভাবে চলমান থাকে। মেলা মানে শুধু স্মরণ নয়, মেলা মানে সামাজিক স্মৃতি সংরক্ষণ।
ফকির মাওলা দরবার শরীফে, আব্দুর রশিদ সরকার ও ওনার পীর আনোয়ার দেওয়ানের স্বরণে বার্ষিক অনুষ্ঠান, সাপ্তাহিক ও মাসিক সূফী মজলিস এছাড়াও ইসলামি বিশেষ দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানাদি হয়ে থাকে
আব্দুর রশিদ সরকার রহঃ এর অমর বাণী গান, বই, অডিও ভিডিও আকারে প্রকাশিত হয়েছে। সকল সোস্যাল মিডিয়াতে প্রচার প্রসার ও সংরক্ষিত আছে।
ছাত্র ভক্ত শিশ্যদের মাধ্যমেও বংশ পরম্পরা চলমান আছে সাধকের গানগুলো।
৮) সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি
* জন্ম: ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩, বৃহস্পতিবার; গ্রাম আজিমপুর, থানা সিংগাইর, জেলা মানিকগঞ্জ
* পিতা-মাতা: আইনুদ্দিন পত্তনদার ও রূপজান বিবি
* দাদা-নানা: আহাদী পত্তনদার ও হযরত আলী মাদবর
* গানের শিক্ষা: ওস্তাদ আনোয়ার দেওয়ানের কাছে বিচার গান
* শিষ্যত্ব: বৈরাবর দরবার শরিফের পীর কেবলা আউলাদে রাসূল গোলাম মওলা রেজভী (তুলা চাঁন) কাছে শিষ্যত্ব গ্রহন করেন ।
* খেলাফত: পরবর্তীতে খেলাফত প্রাপ্ত হন
* দরবার প্রতিষ্ঠা: পীরের আদেশে আজিমপুরে ফকির মওলা দরবার শরিফ
* ওফাত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, শনিবার, রাত ১০টা
* উত্তরাধিকার: ওফাত দিবসে প্রতি বছর সাধুর মেলা হয়
৯) শেষকথা: নদী যেমন থামে না, স্মৃতিও তেমনি
আব্দুর রশিদ সরকারের জীবনকে যদি একটি বাক্যে ধরতে হয়—তবে বলা যায়: তিনি ছিলেন নদীবিধৌত জনপদের এমন এক সাধক, যিনি গানকে বানালেন বোধের বাহন, শিষ্যত্বকে বানালেন শৃঙ্খলার পথ, আর দরবারকে বানালেন মহব্বতের কেন্দ্র।
আজ মেলার ভিড়ে যখন কেউ তাঁর নাম নেয়, তখন সেটি শুধু একজন ব্যক্তির নাম নয়—এটি আজিমপুর গ্রামের এক চলমান স্মৃতির নাম, একটি আধ্যাত্মিক স্রোতের নাম।
আমাদের চ্যানেল পরিবারের পক্ষ থেকে মহান সাধকের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি
Leave a Reply