
মৌনতা থেকে মহাগর্জন: বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মহাকাব্য
আশরাফুল আলম তাজ
ঢাকা | ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
পরিচয়ের পুনর্জন্ম: অবগুণ্ঠনের আড়াল থেকে রাজপথে
খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় হলো তাঁর পরিচয়ের আমূল রূপান্তর। ১৯৮১ সালের সেই রক্তাক্ত প্রভাতে—যেদিন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন—এক গৃহবধূর ব্যক্তিগত জীবন হঠাৎ রাষ্ট্রীয় নিয়তির সঙ্গে অদৃশ্য এক সুতোয় বাঁধা পড়ে। অবগুণ্ঠনের আড়ালে থাকা নীরব নারী ধীরে ধীরে পরিণত হন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অবিসংবাদিত মুখে। নীরবতা রূপ নেয় দৃঢ় উচ্চারণে, অনিচ্ছা পরিণত হয় কর্তব্যবোধে।
নেতৃত্বের নির্মাণ: আপসহীনতার অগ্নিপথ
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গৃহবন্দিত্ব ও রাজনৈতিক চাপ—কোনোটিই তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। এই সময়ই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত হন। বহু বিশ্লেষকের মতে, এখানে তিনি স্বামীর সামরিক ভাবমূর্তিকেও অতিক্রম করে এক গণনেত্রীতে রূপান্তরিত হন, যেখানে ক্ষমতার মোহ নয়, প্রতিরোধই ছিল তাঁর রাজনৈতিক পুঁজি।
রাজনীতির তিক্ত ব্যাকরণ
দুই বেগমের দ্বন্দ্ব—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিন দশক ধরে প্রভাবশালী বাস্তবতা হিসেবে বিরাজ করে। এই দ্বৈরথ কেবল আদর্শিক সীমায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; ব্যক্তিগত অনাস্থা ও প্রতিহিংসার আবরণে তা ক্রমশ রূপ নেয় শূন্য-সমতার খেলায়। সংলাপ ও সহনশীলতার ভাষা হারিয়ে যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিধাবিভক্তির চাপে পড়ে, এবং গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায়।
অর্জনের আলো ও ব্যর্থতার ছায়া
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার শাসনামল ছিল দ্বিমুখী বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একদিকে নারী শিক্ষার প্রসার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও মুক্তবাজার অর্থনীতির অগ্রযাত্রা তাঁর শাসনের উজ্জ্বল দিক। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধী শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক মিত্রতা, সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতির বিস্তার তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে গভীর ছাপ রেখেছে। কখনও কখনও ক্ষমতার কৌশল আদর্শের চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে—এই নির্মম সত্য তাঁর শাসনামলেই প্রকট।
ইতিহাসের নির্মমতা
নীরবতা ও নিঃসঙ্গতা রাজনীতির নিষ্ঠুর পরিহাস। একসময়ের রাজপথ কাঁপানো নেত্রী শেষ প্রান্তে এসে মোকাবিলা করেছেন কারাগারের দেয়াল, অসুস্থতা এবং রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতার সাথে। তাঁর শারীরিক ও রাজনৈতিক অনুপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—এই উত্তরাধিকার কে বহন করবে, এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতি কোন দিশায় এগোবে?
উপসংহার
বেগম খালেদা জিয়া কোনো একরৈখিক চরিত্র নন। তিনি দেশপ্রেম, জেদ, সাহস, সাফল্য ও ব্যর্থতার জটিল সমাহার। তাঁর উত্থান অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে, আর তাঁর পতন ও নীরবতা রাজনৈতিক শিক্ষার এক গভীর পাঠ হয়ে উঠবে। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার অভিঘাত ইতিহাসে দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হয়—খালেদা জিয়ার জীবন সেই সত্যেরই এক প্রগাঢ় দলিল।
Leave a Reply