
গানে, প্রেমে জজবায় প্রেমময় বাবা নজরুল
– মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী
পর্ব – ৫ | পড় দুরুদ নবী মোস্তফায়
ভূমিকা
বাংলা সুফি সাহিত্যের ধারায় হামদ-নাত, কাওয়ালি ও মরমি কাব্যের একটি উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য হলো—সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ককে প্রেমের আলোকে ব্যাখ্যা করা। কুমিল্লা বুড়িচং-এর “নজরুলীয়া দরবার শরীফ”-এর প্রতিষ্ঠাতা, যুগশ্রেষ্ঠ সূফী সাধক, আধ্যাত্মিক লেখক ও গবেষক, খলিফায়ে গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী, আল্লামা পীর নজরুল ইসলাম সাদকপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বাবাজান কেবলার রচিত কালাম “পড় দুরুদ নবী মোস্তফায়” সেই ধারারই এক গভীর আধ্যাত্মিক দলিল।
এই কালামের একটি অংশ—“পড় দুরুদ নবী মোস্তফায়”—শুধু নাত বা প্রশস্তিগীতি নয়; এটি সৃষ্টিতত্ত্ব, নূর-এ-মুহাম্মদী দর্শন, রূহের রহস্য এবং প্রেমভিত্তিক তাওহিদের এক সুচিন্তিত কাব্যিক ব্যাখ্যা। এখানে আমরা কালামটির পাঠ-প্রসঙ্গ, আধ্যাত্মিক তাৎপর্য, তাত্ত্বিক ভিত্তি ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করবো।
১. কালামের সারকথা: প্রেম থেকেই সৃষ্টি
কালামের সূচনা—
“যখন আল্লাহ ছিলেন একা / নাহি ছিল কোন সখা / প্রকাশ হইতে যখন মনে চায়”
এখানে বাবাজান ‘ওয়াহদাত’ বা একত্বের ধারণা তুলে ধরেছেন। ইসলামি আকিদা অনুযায়ী আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। সুফি দর্শনে এই একত্বের অভিব্যক্তি ঘটে ‘তাজাল্লি’ বা আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। বিখ্যাত কুদসি হাদিসের ভাষায়—
“আমি ছিলাম এক গোপন ধন; আমি চাইলাম পরিচিত হতে, তাই সৃষ্টি করলাম সৃষ্টিজগৎ।”
যদিও এই হাদিসটি মুহাদ্দিসদের মধ্যে সহিহ হিসেবে সর্বসম্মত নয়, তবু সুফি তত্ত্বে এটি একটি কেন্দ্রীয় দার্শনিক ভিত্তি। বাবা নজরুল সেই তত্ত্বকে কাব্যভাষায় রূপ দিয়েছেন—আল্লাহর ‘প্রকাশ হইতে মনে চাওয়া’ মানেই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সূচনা।
২. নূর-এ-মুহাম্মদী: সৃষ্টির প্রথম আলো
“আপন নূর হইতে হুদা / হাবিবের নূর করলেন জুদা”
এখানে ‘নূর-এ-মুহাম্মদী’ তত্ত্বের উল্লেখ রয়েছে। বহু সুফি তাফসির ও কিতাবে বর্ণিত আছে যে, সৃষ্টির সূচনায় আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথম নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নূর সৃষ্টি করেন। বিখ্যাত বাণী—
“আওয়ালু মা খালাকাল্লাহু নূরী”
(আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন)
যদিও এই হাদিসের সনদ নিয়ে বিতর্ক আছে, সুফি তরিকার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় এটি ব্যাপকভাবে গৃহীত। বাবাজান কেবলা এই তত্ত্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যাতে বোঝা যায়—মুহাম্মদী নূরই হলো সৃষ্টি জগতের উৎসপ্রভা।
“জুশ মারিলেন এস্কের ধরিয়ায়”—এখানে ‘ইশক’ বা প্রেমকে সৃষ্টি-প্রক্রিয়ার চালিকাশক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। সৃষ্টির পেছনে আছে প্রেমের বিস্ফোরণ, নূরের বিকিরণ।
৩. “নবী যদি না হইত কিছুই পয়দা না করিত”: হাকিকতে মুহাম্মদিয়া
“নবী যদি না হইত কিছুই পয়দা না করিত / অন্ধকারে থাকতো এই ধরায়”
এই পংক্তি ‘হাকিকতে মুহাম্মদিয়া’ ধারণাকে সামনে আনে। অর্থাৎ নবী করিম (সা.) কেবল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন; তিনি সৃষ্টির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও কারণ।
কুরআনে বলা হয়েছে—
“ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রহমাতাল্লিল আলামীন”
(আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।)
সুফি ব্যাখ্যায় এই ‘রহমত’ শুধু মানবজাতির জন্য নয়; সমগ্র সৃষ্টির অস্তিত্বের ভিত্তি। তাই বাবাজান কেবলা বলেন—নবী না হলে কোন কিছু সৃষ্টি হতো না, সব থাকতো অন্ধকারে পরে থাকতো । এখানে ‘অন্ধকার’ হলো জাহেলিয়াত, অজ্ঞতা ও অস্তিত্বহীনতার রূপক।
৪. আদম (আ.) ও রূহের সংলাপ: নূরের অন্তর্গত রহস্য
কালামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—
“আল্লাহ বানাইয়া আদমেরে / রুহুকে হুকুম করে / যাও রুহ আদমের অন্তরায়”
“অন্ধকার দেখিয়া রুহু কান্দিলেন…”
এই অংশে কুরআনের সুরা হিজর (১৫:২৯)-এর ইঙ্গিত রয়েছে—
“ফা-ইযা সাওয়াইতুহু ওয়া নাফাখতু ফীহি মিন রূহী…”
(আমি যখন তাকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তার মধ্যে আমার রূহ থেকে ফুঁ দিলাম…)
বাবাজান এখানে একটি কল্পনামূলক আধ্যাত্মিক দৃশ্য নির্মাণ করেছেন—রূহ আদমের দেহে প্রবেশ করতে গিয়ে ‘অন্ধকার’ দেখে কান্না করে। এই অন্ধকার মানবদেহের জড়তা ও নফসানিয়াতের প্রতীক।
পরে—
“এবার লইয়া নূরে মোহাম্মদী / আদমের পেশা নিতে দিলেন মাখী”
অর্থাৎ নূর-এ-মুহাম্মদীর সংযোগে আদমের দেহ আলোকিত হয়; রূহ তখন স্বাচ্ছন্দ্যে প্রবেশ করে। এখানে বার্তা স্পষ্ট—মানব অস্তিত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা মুহাম্মদী নূরের সংস্পর্শে।
৫. দুরুদের আহ্বান: সময় ফুরিয়ে যায়
প্রতিটি স্তবকের শেষে—
“গ সময় যায়, পড় দুরুদ নবী মোস্তফায়”
এটি একটি আধ্যাত্মিক রিফ্রেন (refrain)। সময় অস্থায়ী; জীবন ক্ষণিক। তাই মুক্তির পথ—দুরুদ শরীফ পাঠ।
কুরআনে আল্লাহ বলেন—
“ইন্নাল্লাহা ওয়া মালাইকাতাহু ইউসল্লূনা আলান নবী…”
(নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন…)
সুফি সাধনার কেন্দ্রে থাকে দরুদ ও জিকির। শাহেনশাহে সাদকপুরী বাবা নজরুল সেই চর্চাকে গানের ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে সহজ করে তুলেছেন।
৬. সাহিত্যিক বিশ্লেষণ
ক. ভাষা ও উপভাষার ব্যবহার
কালামে আঞ্চলিক শব্দ—“মালেকশাঁই”, “পচিনা”, “জুদা”—ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়েছে। এতে গ্রামীণ বাংলার মরমি কাব্যধারার স্বাদ পাওয়া যায়।
খ. রূপক ও প্রতীক
*অন্ধকার → জড়তা, অজ্ঞতা
* নূর → আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও প্রেম
* ইশক → সৃষ্টির মূল শক্তি
* রূহের কান্না → আত্মার প্রকৃত ঠিকানার আকুলতা
গ. সুর ও কাঠামো
রিফ্রেন-ভিত্তিক গঠন কাওয়ালি ও মাইজভান্ডারী গানের বৈশিষ্ট্য বহন করে। সমবেত পরিবেশনার জন্য উপযোগী।
৭. মাইজভান্ডারী ও নজরুলীয়া ধারায় অবস্থান
মাইজভান্ডারী তরিকা বাংলায় প্রেমভিত্তিক তাওহিদ ও নবীপ্রেমকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আল্লামা পীর নজরুল ইসলাম সাদকপুরী (রহ.)-এর রচনায় আমরা দেখি—
* তত্ত্ব ও প্রেমের সমন্বয়
* কুরআনিক ইশারা ও সুফি দর্শনের কাব্যরূপ
* সাধারণ মানুষের উপযোগী ভাষায় গভীর আধ্যাত্মিক আলোচনা
এই কালাম সেই ধারার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
উপসংহার
“পড় দুরুদ নবী মোস্তফায়” কেবল একটি নাত নয়; এটি সৃষ্টির সূচনা থেকে মানব আত্মার পরিপূর্ণতা পর্যন্ত এক আধ্যাত্মিক ভ্রমণ। এখানে আল্লাহর একত্ব, নূর-এ-মুহাম্মদীর তত্ত্ব, আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, রূহের রহস্য—সবকিছুই প্রেমের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বাবাজান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—
সময় চলে যাচ্ছে। জীবন ক্ষণস্থায়ী।
অতএব, মুক্তির পথ নবীপ্রেমে, দুরুদে, ইশকে।
“গ সময় যায়, পড় দুরুদ নবী মোস্তফায়।”
এটাই কালামের মর্ম, এটাই সুফি সাধনার সারকথা—
সৃষ্টি প্রেম থেকে, পরিণতি প্রেমেই।
নিম্নে পুরো কালামটি দেওয়া হল-
পড় দুরুদ নবী মোস্তফায়
গ সময় যায়, পড় দুরুদ নবী মোস্তফায়
যখন আল্লাহ ছিলেন একা
নাহি ছিল কোন সখা
প্রকাশ হইতে যখন মনে চায়
আপন নূর হইতে হুদা
হাবিবের নূর করলেন জুদা
জুস মারিলেন এস্কের ধরিয়ায়
গ সময় যায় || ঐ
মোহাম্মদী পচিনা হইতে
আপে আল্লাহ পাক জাতে
সৃজন করলো সারা দুনিয়া
নবী যদি না হইত কিছুই পয়দা না করিত
অন্ধকারে থাকতো এই ধরায়
গ সময় যায় || ঐ
আল্লাহ বানাইয়া আদমেরে
রুহুকে হুকুম করে
যাও রুহ আদমের অন্তরায়
অন্ধকার দেখিয়া রুহু কান্দিলেন যে উহু উহু
অন্ধকারে থাকা বিষম দায়
গ সময় যায় || ঐ
এবার লইয়া নূরে মোহাম্মদী
আদমের পেশা নিতে দিলেন মাখী
হুকুম দিলেন আবার যাও সেথায়
রুহু বলে মালেকশাঁই
থাকতে আর আপত্তি নাই
এবার বড় সুন্দর দেখা যায়
গ সময় যায় || ঐ
#আমাদের_চানেল #মোহাম্মদ_মহররম_হোসেন_মাহ্দী #viralpost2026 #NazruliyaDorbarrSharif #SufiResearch #IslamicFeature #BanglaArticle #DurudSharif #NobiPrem #NooreMohammadi #SpiritualWriting #BanglaIslamicContent #OurChannelOfficial #TrendingNow #SufiLove #MizanurRahmanStyle #BanglaViral #IslamicScholarship #Maizbhandari #FeatureWriting #DeenO
Leave a Reply