
রাজনীতির নির্বাসন: নৈতিকতার বিলুপ্তি ও জনতন্ত্রের অভিশাপ — আশরাফুল আলম তাজ
ভূমিকাঃ আদর্শের নির্বাপণ মানব-সভ্যতার ক্রমবিকাশে রাষ্ট্র ও রাজনীতি দুইটি অপরিহার্য মেরুদণ্ড, যাহাদের উপর নির্ভর করিয়া জনজীবনের বিশাল সৌধ নির্মিত হয়। রাষ্ট্র যেখানে মানুষের সমষ্টিগত আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্র, রাজনীতি সেখানে পরিচালনার শুদ্ধতম শিল্প। কিন্তু যখন সেই পরিচালন-রীতি তাহার নৈতিক আলোক হারায়, তখন গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রই এক নিদারুণ অমাবস্যার তলে নিমজ্জিত হয়। ক্ষমতা তখন আর দায়িত্বের পবিত্র প্রতীক থাকে না, তাহা হইয়া ওঠে লিপ্সা ও দখলের কদর্য ক্রীড়াক্ষেত্র। এই ঘোর অবক্ষয়কালে আদর্শের মৃত্যু ঘটে নীরবে, আর জনতা কেবল প্রত্যক্ষ করে এক অনিবার্য পতনের করুণ মহাকাব্য।
রাজনীতির নৈতিক উৎস ও বিচ্যুতি
প্রাচীন গ্রিসের ‘পোলিস’ ধারণা হইতে শুরু করিয়া ভারতবর্ষের ‘রাজ-নীতি’ (রাজনীতি) পর্যন্ত, ইহার মূলমন্ত্র ছিল এক—তাহা হইল ‘ধর্ম’ বা নৈতিকতা। রাজনীতি ছিল দার্শনিক ও নীতিবান পুরুষের উচ্চ মার্গের ব্রত, জনকল্যাণই ছিল যাহার একমাত্র অগ্নিহোত্র। নীতিই ছিল শাসনের ভিত্তি, ক্ষমতাই ছিল করুণার প্রতীক।
কিন্তু কালের কুটিল স্রোতে এই নীতি-শিল্প কখন যেন পেশার মলিন রূপে রূপান্তরিত হইল। আজিকার রাজনীতিতে ‘নীতি’-কে নির্বাসন দিয়া ‘কৌশল’ আসীন, আদর্শের স্থানে কেবলই স্বার্থের বিষাক্ত ফণা। জনসেবার ব্রত বিলীন হইয়া গিয়াছে ক্ষমতার মসনদ দখলের জিঘাংসায়; রাজনীতি আজ পেশা হইতে ব্যবসায়-এ পরিণত।
অবক্ষয়ের মূল শেকড়
এই নৈতিক অবক্ষয়ের শেকড় বহুবিস্তৃত ও গভীর। ইহাকে কয়েকটি মরীচিকার ন্যায় কারণের দ্বারা চিহ্নিত করা যায়:
১. ক্ষমতার মরীচিকা: ক্ষমতা এখন এক মায়া, যাহা তৃষ্ণা নিবারণ না করিয়া কেবল বাড়াইয়া চলে। এই লিপ্সা রাষ্ট্রনায়কের দৃষ্টিকে জনকল্যাণ হইতে ব্যক্তিগত ঐশ্বর্যের দিকে ফিরাইয়া দেয়।
২. অর্থের সর্বগ্রাসী গ্রাস: অর্থই আজ রাজনীতিতে প্রধান নিয়ামক। অর্থনৈতিক আধিপত্যের নিকট প্রার্থী, নীতি ও জনমত—সকলেই যেন বিক্রীত পণ্য। ফলে নীতি-নির্ধারণ হয় পুঁজির স্বার্থে, জনগণের নহে।
৩. বিচারের নিষ্ক্রিয়তা ও বিবেকের নির্বাসন: যখন রাষ্ট্র তাহার বিচারযন্ত্রে জবাবদিহিতাকে বিলুপ্ত করে, তখন দুর্নীতি এক অমোঘ ভাইরাসের ন্যায় প্রতিটি প্রশাসনিক রক্তকণিকায় ছড়াইয়া পড়ে। বিবেকের মৃত্যু ঘটে, আর ক্ষমতা হয় অজেয়।
৪. আদর্শের শূন্যতা: নৈতিক শিক্ষার অভাবে এবং দ্রুত সাফল্যের মোহে নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে যুক্ত হইতেছে আবেগ ও স্বার্থ দিয়া, আদর্শ দিয়া নহে।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রতিফলন
নৈতিকতার এই বিপর্যয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে অভ্যন্তর হইতে ভঙ্গুর করিয়া তোলে। বিবেকহীন শাসকেরা রাষ্ট্রকে এক ব্যক্তিগত ভোগভূমি রূপে গণ্য করে। জনকল্যাণ তখন কেবল নির্বাচনী ইশতেহারের অলীক প্রতিশ্রুতি মাত্র, আর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয় কেবল রাজনৈতিক অভিসন্ধি সিদ্ধির তরে। ন্যায়বিচার তখন আর সাধারণের অধিকার থাকে না, তাহা পরিণত হয় কতিপয় সুবিধাভোগীর বিলাসদ্রব্যে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র নামক মহৎ প্রতিষ্ঠানটি তাহার আত্মার ক্ষয় প্রত্যক্ষ করে।
সমাজের উপর প্রগাঢ় ছায়া
এই নৈতিক শূন্যতা সমাজে সৃষ্টি করে এক প্রগাঢ় হতাশা ও নীরব অরাজকতা। জনমানসে জন্ম লয় এক গভীর অবিশ্বাস, যেখানে আস্থা ও বিশ্বাস উভয়ই নির্বাসিত। মানুষ তখন সত্যের পথে না চলিয়া, সুবিধাবাদিতার পঙ্কিল পথে আশ্রয় লয়। আদর্শকে আখ্যা দেওয়া হয় অবাস্তব প্রলাপ, আর অসততাই হইয়া ওঠে ‘বাস্তবতার’ নতুন সংজ্ঞা। এই সঙ্কট বুদ্ধিজীবী সমাজকে করে নীরব, যুব-চৈতন্যকে করে বিভ্রান্ত। বিবেকের মৃত্যু ঘটে বিনা শবযাত্রায়।
নবজাগরণের আহ্বান: আশার আলোকবর্তিকা
তবুও মানব ইতিহাসে নবজাগরণ আসিবেই। এই ক্ষয়িষ্ণু ভিত্তিকে পুনর্বার সুদৃঢ় করিতে হইলে চারিত্রিক ও নৈতিক শিক্ষার শেকড়কে গভীরে প্রোথিত করিতে হইবে। রাজনৈতিক সংস্কারে আবশ্যক সেই নীতিবান পুরুষের অভ্যুদয়, যিনি ক্ষমতাকে দায়িত্বের নির্মল দৃষ্টিতে দেখিবেন। আইনের শাসনকে কেবল পুঁথির বাণী হইতে মুক্ত করিয়া প্রতিটি স্তরে তাহা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। রাজনীতিকে আবারও ব্যবসায় হইতে ব্রততে ফিরাইয়া আনিতে হইবে।
উপসংহার
রাষ্ট্র ও রাজনীতির নৈতিক অবক্ষয় একটি সভ্যতার আত্মার ক্ষয়। ক্ষমতা যখন নীতিকে গ্রাস করে, তখন রাষ্ট্র হইয়া ওঠে ভয় ও লিপ্সার উপাসনা-ভূমি। কিন্তু নৈতিকতা মানুষের অন্তরেই নিহিত—তাহাকে পুনর্জাগ্রত করিতে হইবে মনন ও মূল্যবোধের মাধ্যমে।
রাষ্ট্রকে টিকাইয়া রাখিতে হইলে দরকার কেবল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নহে, নৈতিক হৃদয়সম্পন্ন মানুষ। রাজনীতি যদি আবার ফিরিয়া পায় তাহার হারানো নীতি, তবে রাষ্ট্র আবারও হইতে পারে ন্যায়, মানবতা ও আশার আশ্রয়।
শেষ পঙ্ক্তি:
“নীতিবিহীন শক্তি—তাহা এক অভিশাপের ভার।
আদর্শেই মুক্তি, আর বিবেকই সেই মুক্তির চাবিকাঠি।”
Leave a Reply