
সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে যখনই ন্যায়বিচারের কণ্ঠ রুদ্ধ হয় এবং শোষণের পাষাণ প্রাচীর আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, তখনই কলম রূপান্তরিত হয় তপ্ত কৃপাণে। ‘অগ্নিগর্ভ উপাখ্যান: শোষিতের রণভেরী’ কেবল সুবিন্যস্ত শব্দের কোনো কাব্যিক বিলাস নয়, বরং এটি সময়ের জঠরে জন্ম নেওয়া এক জীবন্ত প্রলয়-হুঙ্কার ৷
অগ্নিগর্ভ উপাখ্যান: শোষিতের রণভেরী, আশরাফুল আলম তাজ
বর্তমান কালখণ্ড কোনো তমসাবৃত গহ্বর নয়—
তার জঠরে সযতনে লালিত আজ প্রলয়-দহন।
অনাচারের স্তূপ প্রজ্জ্বলিত—
ঠিক যেন জীবন্ত কঙ্কালের বীভৎস মিছিল;
আর সমীরণের প্রতিটি তপ্ত দীর্ঘশ্বাস
মৌনতার বক্ষ বিদীর্ণ করে ঘটাচ্ছে
অদৃশ্য আণবিক বিস্ফোরণ।
ন্যায়বিচার— সে তো এক অভিশপ্ত শব্দবন্ধ,
তোষামোদের মখমলে আবৃত এক নিপুণ ছলনা;
প্রমত্ত ক্ষমতার ওষ্ঠে তার উচ্চারণ
কেবলই প্রবঞ্চনার প্রতিধ্বনি।
আমি সেই ভস্মস্তূপে এক রুদ্র স্ফুলিঙ্গ—
যে স্বীয় সত্তার গূঢ় সৌরভ
নিজ ছায়ার কাছেও বিকিয়ে দেয় না।
এই ক্ষোভ লবণাক্ত—
ধমনীর স্রোতে তা আজ তপ্ত সীসকের ন্যায় স্পন্দিত।
নগর, প্রাসাদ আর ওই সুসজ্জিত প্রহসন—
সবই আজ মহাকালের ভস্মীভূত হওয়ার অপেক্ষায়।
তোমাদের শ্বেতশুভ্র পাষাণের হর্ম্যে
উৎসব চলে আর্তনাদের করুণ সুরে,
রুধিরের লোনা আস্বাদনে।
সেথা বিধিবিধান কেবলই ঊর্ণনাভের জাল—
ক্ষুদ্র যেখানে অবরুদ্ধ,
আর আততায়ী সগৌরবে পরিক্রমণ করে রাজপথে।
হে ক্ষমতার মদমত্ত স্থপতি, অবহিত হও—
আমাদের সহিষ্ণুতার হিমাদ্রি
আজ এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মোহনায় দণ্ডায়মান।
যাদের তুমি ধূলিকণা জ্ঞানে উপেক্ষা করেছিলে,
তারাই আজ লেলিহান শিখার দুর্নিবার স্রোত।
তোমাদের রত্নখচিত সিংহাসন
এখন তপ্ত অঙ্গারের কণ্টকশয্যা;
ঐশ্বর্যের ওই প্রাচীর—
যা কোটি বুভুক্ষুর লুণ্ঠিত ইষ্টকে নির্মিত—
তাতে ফাটল ধরেছে আমাদের হাহাকারের উত্তাপে।
আমরা সেই নগণ্য দীপশলাকা,
যাদের তুমি তুচ্ছ ভেবে পদদলিত করেছিলে।
আজ শব্দের বিন্যাসে বারুদ জেগেছে—
ঘর্ষণে ঘর্ষণে জন্ম নিচ্ছে দুর্জয় সাহস।
অলংকার নেই, আছে কেবল দহন।
আমাদের সমবেত চিৎকার
চূর্ণ করে দেবে মিথ্যার ওই সহস্রাব্দের তাসের প্রাসাদ।
আমরা ক্ষুদ্র, তবুও মহাপ্রলয়ের আদি উৎস।
আজ তোমাদের সাজানো উদ্যান শ্মশানের অভিমুখে।
অগ্নির কোনো ভাষা নেই— আছে কেবল গ্রাস।
অনিয়মের এই কঙ্কালসার অরণ্যকে
আমি উৎসর্গ করলাম লেলিহান শিখায়।
প্রতিটি শব্দ আজ রণভেরী,
প্রতিটি বাক্য যেন এক একটি উলঙ্গ কৃপাণ।
গৃহহারা হওয়ার শোক আজ রূপান্তরিত
সাম্রাজ্য চূর্ণের উন্মত্ত উল্লাসে।
লেখনীর নিব থেকে আজ ক্ষরিত হচ্ছে তপ্ত সীসা—
শোষণের অক্ষরগুলো একে একে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে।
এটি কেবল সাহিত্য নয়, নয় কোনো সৌখিন বিলাস—
এটি শোষিতের শেষ অব্যর্থ বুলেট।
উপমা এখানে কামানের গোলার ন্যায় প্রলয়ঙ্করী,
রূপকগুলো যেন বিষাক্ত তীরের তীক্ষ্ণ ফলা।
ভণ্ডামির ওই বেদী আজ জ্বলে উঠুক।
মিথ্যার মহাফেজখানা পুড়ে হোক ছাই।
দুর্নীতির ওই কালসাপ ফণা তুলে আছে—
আমরা সেই বিষধরকে দহন করব,
সিংহাসনের প্রতিটি স্তম্ভ সমূলে উৎপাটিত করব।
আজ কবিতা মানেই দহন— এক জীবন্ত প্রলয়পিণ্ড।
শৃঙ্খলের সেই ঝনঝনানি আজ আর ত্রাস জাগায় না;
বরং শোণিতধারায় জন্ম দেয় অভিনব বিদ্রোহ।
দিগন্তরেখা চিরে ধেয়ে আসছে সহস্র রুদ্র মিছিল—
হস্তে তাদের পুষ্প নয়, প্রজ্জ্বলিত মশাল।
গলিপথ থেকে রাজপথ, বন্দর থেকে নগর—
এই বিদ্রোহের অগ্নি আজ অতি সংক্রামক।
আমরাই সেই বারুদ— যারা ইতিহাসের মানচিত্র পুনর্লিখন করে।
বুলেটের চেয়েও অধিক শক্তিশালী আমাদের হৃদস্পন্দন,
মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করে আমরা ধাবিত হচ্ছি অগ্নিসমুদ্রের পানে।
এই মিছিল অবিনাশী— এই যুদ্ধ জরাগ্রস্ত মিথ্যার বিরুদ্ধে।
এখন প্রতিটি স্তূপই এক একটি চিতাশাল।
দম্ভের অনিবার্য মৃত্যু সমাগত।
ভস্মের গভীর থেকে ফিনিক্সের ন্যায় ডানা মেলবে
এক নবীন ঋতু।
মানুষের একমাত্র পরিচয় হবে ‘মানুষ’,
শৃঙ্খলিত কোনো দাস থাকবে না মহাবিশ্বে।
অন্তিম কলঙ্ক দগ্ধ হয়ে বাতাসে লীন না হওয়া পর্যন্ত
আমাদের এই অভিযাত্রা থামবে না।
আজ এই বিস্ফোরক গোধূলিলগ্নে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা—
জয় আমাদেরই সুনিশ্চিত।
শ্মশানের চিতা নির্বাপিত হলে
উদিত হবে এক অমল শুভ্র ঊষা।
ক্রন্দনের স্থলে প্রতিধ্বনিত হবে হাসি,
বৈষম্যের চিতাভস্মে রচিত হবে সাম্যের ভিত্তি।
আমরাই ধ্বংস করেছি, আমরাই সৃজন করব—
প্রলয়ের হাত ধরেই আসবে মুক্তির আদিম আনন্দ।
এই ‘অগ্নিস্বর’ই হোক আমাদের অবিনাশী ধ্রুবতারা।
Leave a Reply