
স্মৃতির ওপর বুলডোজার: স্মৃতিবিনাশী রাষ্ট্রতত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ, আশরাফুল আলম তাজ
(শব্দে সময়কে প্রশ্ন করা এক নাগরিক কণ্ঠ)
ভূমিকা: রাষ্ট্র যখন নিজেই নিজের ইতিহাসহন্তা
রাষ্ট্র কেবল কিছু ভৌগোলিক সীমানা কিংবা যান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সমষ্টি নয়; রাষ্ট্র মূলত একটি ‘স্মৃতিসত্তা’। একটি জাতির সহস্র বছরের যূথবদ্ধ স্বপ্ন, রক্তস্নাত সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের যে বিমূর্ত মানচিত্র—রাষ্ট্র তারই অভিভাবক। কিন্তু ইতিহাসের কোনো এক অন্ধকার বাঁকে যখন রাষ্ট্র নিজেই নিজের আদি উৎস, স্মারক কিংবা ইতিহাসের প্রতীকী অবয়ব ধ্বংস করতে উদ্যত হয়, তখন তা আর কেবল স্থাপনা ভাঙার কর্মসূচি থাকে না; তা রূপ নেয় এক ভয়াবহ ‘স্মৃতিবিনাশী রাষ্ট্রতত্ত্ব’-এ ৷ এই হঠকারিতা মূলত সত্যের বিরুদ্ধে মিথ্যার, সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বর্বরতার এবং ইতিহাসের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার এক সুসংগঠিত যুদ্ধ—যেখানে রাষ্ট্র ক্ষমতার দম্ভে নিজেরই নৈতিক ভিত্তিকে চূর্ণ করে ফেলে।
ধানমন্ডি ৩২: ইতিহাসের নাভিদেশ ও যন্ত্রণার শিলালিপি
ধানমন্ডি ৩২ কোনো সাধারণ কাঠামোগত ঠিকানা নয়; এটি বাঙালির রাষ্ট্রসত্তার ভ্রূণকোষ। এই গৃহের প্রতিটি দেয়াল বাংলাদেশের স্বাধীনতা-অভিমুখী প্রস্তুতির নির্ঘুম রজনী এবং এক জাতির সার্বভৌম হয়ে ওঠার মহাকাব্যিক অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী। যারা এই স্থাপনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চায়, তারা মূলত একটি সময়কালকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু ইতিহাস কোনো নশ্বর দালান নয় যে হাতুড়ির আঘাতে তার অপমৃত্যু ঘটবে। ইতিহাস হলো সেই আয়না—যা ভাঙলে মানুষের মুখচ্ছবি বিলীন হয় না; বরং ভাঙা আয়নার প্রতিটি খণ্ডে প্রতিফলিত হয় ধ্বংসকারীর নিজেরই বিকৃত ও নগ্ন অবয়ব। ধানমন্ডি ৩২ ধ্বংসের বাসনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিকড়হীন করার এক আত্মঘাতী প্রয়াস। যে রাষ্ট্র তার ইতিহাসের স্মারককে শত্রু বলে চিহ্নিত করে, সে রাষ্ট্র আসলে নিজের অস্তিত্বের বৈধতা নিয়েই এক গভীর হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত।
সংস্কৃতির মনন ও অঘোষিত যুদ্ধ: ছায়ানট ও উদীচি
একটি জাতির চৈতন্য গড়ে ওঠে তার সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও নান্দনিক উত্তরাধিকারের ওপর ভর করে। ছায়ানট ও উদীচি কোনো সাধারণ সংগঠন নয়; এগুলো বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবিক মূল্যবোধের দুর্ভেদ্য দুর্গ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এই প্রতিষ্ঠানগুলো সুর ও শব্দের মাধ্যমে মানুষের ভেতরে সংহতির প্রদীপ জ্বালিয়েছে। এদের ওপর আঘাত হানার মনস্তত্ত্ব আসলে একটি জাতির অনুভবশক্তিকে অবশ করে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। রাষ্ট্র যখন সুরকে ভয় পায় কিংবা কবিতাকে আতঙ্ক মনে করে, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে রাষ্ট্র তার মানবিক ভিত্তি হারিয়ে ক্রমে একটি নিপীড়নযন্ত্রে রূপ নিচ্ছে। সংস্কৃতি প্রশ্ন তোলে, বিবেক জাগায়; তাই সংস্কৃতিহীন রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজের নাগরিকদের জন্যই সবচেয়ে বড় অভিশাপে পরিণত হয়।
সংবাদমাধ্যম: আয়না ভাঙার দর্শন ও অন্ধকারের রাষ্ট্রনীতি
সংবাদমাধ্যম একটি সচল রাষ্ট্রের দর্পণ এবং নাগরিকের জাগ্রত কণ্ঠস্বর। সংবাদপত্রের কার্যালয় কিংবা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়ার উন্মত্ততা আসলে সত্যের কণ্ঠরোধ করার এক আদিম উল্লাস। এটি কেবল তথ্যপ্রবাহ রুদ্ধ করার প্রয়াস নয়; এটি জনস্মৃতি থেকে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাকে মুছে ফেলার এক ব্যর্থ কৌশল। প্রশ্নকে অপরাধ এবং সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা একটি ক্ষয়িঞ্চু ও নিরাপত্তাহীন রাষ্ট্রের স্পষ্ট লক্ষণ। যেখানে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়, সেখানে রাষ্ট্র টিকে থাকলেও নাগরিক বিলীন হয়ে যায়; অবশিষ্ট থাকে কেবল অনুগত প্রজার দীর্ঘ সারি।
হঠকারিতার মনস্তত্ত্ব: শক্তির ছদ্মবেশে দুর্বলতার স্বীকারোক্তি
স্থাপনা ভাঙা কিংবা স্মৃতি ধ্বংস করা শক্তির প্রকাশ নয়—এটি চরম মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়ের স্বীকারোক্তি। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র ভিন্নমতকে সহ্য করে এবং ইতিহাসকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়। কিন্তু যুক্তি যখন পরাভূত হয়, তখন রাষ্ট্র বুলডোজারের আশ্রয় নেয়। ইতিহাস নির্মমভাবে শিক্ষা দেয়—যারা হাতুড়ি দিয়ে ইতিহাস মুছতে চেয়েছে, তারা নিজেরাই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের পাদটীকায় কলঙ্কিত হয়ে থেকেছে। হঠকারিতা সাময়িক বিজয় দিতে পারে, কিন্তু কখনোই নৈতিক অমরত্ব দিতে পারে না।
হঠকারিতারোধে রাষ্ট্রীয় দায়বোধ ও অনিবার্য করণীয়
এই স্মৃতিবিনাশী ব্যাধি থেকে রাষ্ট্রকে উদ্ধার করতে হলে রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল নৈতিক সংস্কার প্রয়োজন। অনিবার্য পদক্ষেপগুলো হলো:
সাংবিধানিক রক্ষাকবচ: ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাকে কঠোর সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় আনা।
ইতিহাসের বিরাজনীতিকরণ: জাতীয় স্মারকগুলোকে দলীয় সম্পত্তির ঊর্ধ্বে তুলে ‘জাতীয় উত্তরাধিকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
স্বায়ত্তশাসিত নিরাপত্তা: সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা রক্ষায় স্বাধীন কমিশন গঠন।
মননশীল শিক্ষা: পাঠ্যক্রমে প্রকৃত ইতিহাসবোধ ও পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা নিশ্চিত করা।
বিচারহীনতার অবসান: স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনা।
উপসংহার: স্মৃতি অবিনশ্বর, বিচার অনিবার্য
স্মৃতি ধ্বংস করা যায় না—কারণ স্মৃতি কোনো জড় বস্তু নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রবাহ। ইট-পাথর ভেঙে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা গেলেও মানুষের হৃদয়ে খোদাই করা ইতিহাস মুছে ফেলার সাধ্য কোনো শাসকের নেই। ইতিহাস হয়তো তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নেয় না, কিন্তু সে নিখুঁতভাবে বিচার করে। ক্ষমতার দম্ভ ধুলোয় মিশে যায়, কিন্তু জাতির চেতনা ধ্রুবতারার মতো স্থায়ী হয়ে থাকে। স্মৃতিহন্তা রাষ্ট্র পরাজিত হয়—আর জয়ী হয় সেই অপরাজেয় মানুষ, যারা ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও সত্যের গান গাইতে জানে। কারণ—যে রাষ্ট্র অতীতকে সম্মান করতে জানে না, তার জন্য কোনো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে না।
Leave a Reply