
সফরের দ্বিতীয় পর্ব: নীল-সম্রাটের লীলাভূমিতে পঞ্চ-পথিক — আশরাফুল আলম তাজ
০৯ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রারম্ভ: রোদ্দুরের লাজুক আলিঙ্গন
সকাল ঠিক দশটা।
কলাতলির জানালায় তখনও রেশম-মোড়া সোনালি রোদ্দুরের পেলব আভা। সমুদ্রের অমোঘ আহ্বানে সাড়া দেওয়া আমরা পাঁচজন—পঞ্চ-পথিক—রওনা দিলাম ‘চাঁদের গাড়ি’ নামের কিংবদন্তি বাহনে। মনে হলো, এটি সময়ের চাকা নয়; বরং কোনো অলৌকিক শক্তির অদৃশ্য পরশ, যা আমাদের বহন করে নিয়ে যাচ্ছে এক স্বর্গীয়, নীরব তীর্থের দিকে, যেখানে প্রতিটি পদচিহ্ন নীল-সম্রাটের লীলার স্পর্শে ধন্য।
রাস্তার দুই পাশে সৌন্দর্যের মহার্ঘ্য

যাত্রাপথে দৃশ্যপটের দু’পাশ যেন এক সুবিশাল চিত্রকল্পের ক্যানভাস।
ডানদিকে: সমুদ্র—নীলকান্ত মণি-খচিত এক অনন্ত প্রাসাদ। তরঙ্গেরা ‘শু-শু’ ছন্দে উর্মিমালা পরে অপ্সরার মতো নাচছে; প্রতিটি ঢেউ যেন বালুকার কণায় সোনার চুড়ির মতো ঝংকার তুলছে। রোদ্দুরের শিরা লেগে তরঙ্গের দুলন আমাদের দৃষ্টিকে অতিক্রম করে হৃদয়ের অন্তরতমে এক অদৃশ্য সুরের মূর্ছনা রচনা করছে।
বামদিকে: শ্যামলিমা-মণ্ডিত গিরিমালা। সবুজ স্তম্ভগুলি যেন যুগের পর যুগ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসের নিশ্চল প্রহরী, প্রকৃতির এই মহার্ঘ নীলভূমি যাদের চরণে ছায়া ফেলেছে। পাহাড়ের বুকে জমে থাকা শিশির-রত্ন, বনানীর মৃদু দুলন—সব মিলেমিশে এক অপারময় সবুজ সঙ্গীত সৃষ্টি করেছে। এ যেন স্বরলিপি—ডান-পাশের নীল তরঙ্গ আর বাম-পাশের শ্যামল সবুজের দ্বৈত সুরে মিলেমিশে এক মহাকাব্যের ছন্দ তৈরি করেছে, যা চোখে নয়, হৃদয়ে অনন্তকাল ধরে অনুরণিত হয়।
জিরোপয়েন্ট: পৃথিবীর প্রান্তরেখায় নীলিমার অবগাহন

টেকনাফের জিরোপয়েন্টে পৌঁছে মনে হলো—পৃথিবীর শেষ প্রান্তরেখা নীলিমার অসীমতায় মিলেমিশে এক নীরব বৈরাগীর মতো ধ্যানমগ্ন। সমুদ্রের উদার আলিঙ্গনের স্মৃতি আমাদের অন্তরে এক অদৃশ্য স্মৃতিসৌধ রচনা করল, যেখানে প্রতিটি ঢেউ যেন আমাদের আত্মার গভীরতম প্রদেশে স্পর্শ করে।
শাহপরীর দ্বীপ: সীমান্তরেখার নীলের সাহিত্যময় সুর

এরপর যাত্রা—সীমান্ত-ঘেষা সেই স্বর্গদ্বীপে, যেখানে মায়ানমারের শ্যামল প্রান্তরেখা দূর দিগন্তে নিঃশব্দ প্রতিবেশীর মতো মৃদু হাসে।
শাহপরীর দ্বীপ, যেখানে আকাশের নীল, সমুদ্রের গাঢ় নীল, পাহাড়ের সবুজ এবং মানুষের বিস্ময়—চারটি রঙ মিলেমিশে এক অপরূপ দেবত্বপূর্ণ ক্যানভাস রচনা করেছে।
নীল জল শুধুই তরল নয়—মনে হলো এটি স্বর্গের দরবার থেকে গড়িয়ে পড়া অনন্ত মহিমার দর্পণ, যেখানে সৃষ্টিরঅধিপতি একদিন নিজের রূপের প্রতিচ্ছবি দেখেছিলেন। আমরা সেই প্রতিচ্ছবিকে দেখলাম—অবাক, উদ্বেল, অভিভূত এবং চিত্তে গভীর কৃতজ্ঞতা নিয়ে।
দ্বীপের তটের বালুচরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো—প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি নুড়ি পাথর, প্রতিটি গাছ এক সাহিত্যঘন ছন্দে একে অপরের সাথে কথা বলছে। এ যেন নীল-সবুজের এক মহাকাব্য, যা শোনাচ্ছে সীমান্ত ঘেষা দ্বীপের নীরব কাহিনী, প্রকৃতির মরমি গান, মানুষের বিস্ময় ও রূপকথার এক অবিরাম আলোকময়তা।
ইনানী সূর্যাস্ত: প্রকৃতির হাতে লেখা মহৎ কবিতা

ফেরার পথে ইনানীর বেলাভূমি। সূর্য তখন সাগরজলে লালচে স্বর্ণমঞ্জরি বিসর্জন দিয়ে অস্ত যাচ্ছে। টুপটাপ ডুবের সেই উষ্ণতার মৃদু গর্জনে দিনের সমস্ত দৈহিক ক্লান্তি বিলীন হয়ে সন্ধ্যার লাজুক কোমলিমায় মিলিয়ে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম—মনে হলো, প্রকৃতি আজ নিজ হাতে আমাদের হৃদয়ের খাতায় এক অনন্ত মহৎ কবিতা লিখে দিল।
শেষ বিকেলের হিমছড়ির বুনো সুগন্ধ বাতাসে ভেসে এসে আমাদের গায়ে মেখে দিল এক চূড়ান্ত শান্তিময় আশীর্বাদ।
আমরা পাঁচজন—ক্লান্ত, কিন্তু আত্মিকভাবে পরিপূর্ণ—ফিরে এলাম রিসোর্টের নীরব আশ্রয়ে, যেখানে আমাদের ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন এক মহাকাব্যের মতো রাত্রির বুকে অমরভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে রইল।
Leave a Reply