
কোলাহলমুক্ত প্রত্যাবর্তন: সমুদ্র-মগ্ন মননের প্রথম প্রহর – আশরাফুল আলম তাজ
(কক্সবাজার, ৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫)
[নশ্বর এই মানব-জীবন; এক নিভৃত মনন-সফর—যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং আত্মিক এক অনিবার্য অনুসন্ধানের বাঁকে প্রবাহিত হয়। বৃহৎ প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের দেখি ক্ষণস্থায়ী এক পর্যবেক্ষণশীল ছায়া রূপে; সেই অনুধাবনই এই ভ্রমণকে করে তোলে নীরব এক কৃতজ্ঞতার অভিজ্ঞতা। আলো-ছায়া, জল-স্থল, ছন্দ-স্পন্দন—এ সবই সেই মহান কারিগরের অদৃশ্য স্বাক্ষর; তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কেবল দর্শক নই, বরং স্রষ্টার অপার মহিমায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের ছোট্ট এক অনুপ্রাণিত অংশীদার। এই নিবিড় ভ্রমণ তাই ছিল—এক জাগতিক যাত্রা যা হৃদয়ের গভীরে আধ্যাত্মিক উপলব্ধির সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে।]
দীর্ঘ পথের ক্লিষ্টতা, নাগরিক জীবনের চঞ্চল বহুমুখীতা—এসব ক্লান্তি বিলীন হয়ে গেল দিগন্ত-বিস্তৃত জলরাশির প্রথম আলিঙ্গনে। ৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫-এর প্রথম দিনটি হয়ে উঠল দুই পৃথক, অথচ পরিপূরক প্রহরের যুগলবন্দী: সুগন্ধার ধ্যান এবং লাবণীর স্বর্ণালী উন্মোচন। এ দুটি প্রহর মিলিয়ে দিনটি কেবল ভ্রমণের একটি নাম ছিল না; তা ছিল গভীর মননশীল প্রত্যাবর্তন—অন্তরের এক নীরব সন্ধান।

সুগন্ধা: নীল-নিঃশব্দতার প্রজ্ঞাময় অভিষেক
পূর্ব দিগন্তে অরুণোদয়ের কনকোজ্জ্বল আভা যখন কেবল পাতলা ছায়া মেলেছে, আমি তখন সুগন্ধা সৈকতে পৌঁছলাম। সেই প্রাতঃকালীন সুগন্ধা—এক সদ্যস্নাত, লাজুক কৈশোরিক উপাসিকার মতো—স্নিগ্ধ ও শিশিরে ভরা, প্রতিটি আঙুলে যেন প্রকৃতির ঠোঁটের রং লেগে রয়েছে। পায়ের নিচে নরম বালুকার স্পর্শ; ঢেউয়ের ধীর ধ্বনি যেন এক অনন্তশূন্যের হৃদস্পন্দন। বিশ্বকোলাহল, দফায় দফায় ভর করে থাকা অস্থিরতা—সবই এই নীল-নিঃশব্দতার সামনে স্তিমিত হয়ে যায়।
প্রকৃতির নীরবতাই হয়ে ওঠে উচ্চতম ভাষা। জলরাশির নিরন্তর ছন্দ হলো এক মৌন মন্ত্রোচ্চারণ—হৃদয়ের খাটোখাটো ধূসর ক্ষত, দীর্ঘদিনে জমে থাকা ক্লেদ, সব ধীরে ধীরে মুছে দেয়। সূর্যের প্রথম স্বর্ণালী করুণ স্পর্শ জলাধারের উপর পড়লে মনে হলো জীবন যেন তারই আত্মাকে নবায়ন করল; মনের গ্লানি কুয়াশার মতো ভেসে গেল, আর স্রষ্টার আদি মহিমা রহস্যময়ভাবে ভেসে উঠল।
সুগন্ধা কানে কানে বলল: “থেমে দাঁড়াও, গভীর মনোনিবেশে দেখো, আত্মস্থ করো।” সে ছিল ধ্যানমগ্নতার সেই নিঃশব্দ প্রহর—জানিয়ে দিল, প্রকৃত জ্ঞানের পথ ধীর ও বিনয়ী। এখানে সময় নেই—শুধু ধারণার স্পষ্টতা, আর দিগন্তে মিশে থাকা এক অনন্ত-মাথা নত শ্বাস।

লাবণী: অপার সৌন্দর্যের স্বর্ণালি ঐশ্বর্য
দিনের আলো যখন পশ্চিমাকাশে ধীরে ঢলে যায়, আমি ধীর পদক্ষেপে লাবণীর দিকে এগোলাম। সুগন্ধার তরুণীর স্নিগ্ধতা এখানে রূপান্তরিত হয়েছে এক পূর্ণাঙ্গ লাবণ্যময়ী সম্রাজ্ঞীতে—গোধূলির পর্দায় সেজে, স্বর্ণাভ ঝিলিক ও গৌরবময় উপস্থিতিতে ভাসমান। সূর্যাস্তের মুহূর্তে লালিমার এক ক্ষণস্থায়ী রচনায় লাবণীর জলরাশি হয়ে ওঠে স্বর্গীয় ক্যানভাস; আকাশ, বাতাস, আলো ও জল—চতুর্মূর্তির মতো একসূত্রে মিলিত হয়ে বানায় মহাকাব্যিক দৃশ্যাবলি।
এখানে রঙগুলোর সৌন্দর্য মানুষ নির্মিত নয়; তা মহান কারিগরের স্বয়ং-ইশারায় রচিত। প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি ছায়ার খড়খড়ানি—সবকিছু এক অনুষঙ্গিক কথোপকথন ও সম্মানবোধে গড়ে ওঠে। মন আপনা-আপনি নিমজ্জিত হয় বিনম্রতার সাগরে; হৃদয় ভরে ওঠে এক অব্যক্ত কৃতজ্ঞতায়—কারণ এমন অলৌকিক দৃশ্য কেবল সৃষ্টিকর্তার করুণাই সম্ভব করে।
লাবণীর গোধূলি এক নীরব অনুশাসনে বলছিল: “তোমার বিনম্র কৃতজ্ঞতাই তোমাকে তোমার পরম সত্তার সান্নিধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।” সেই ক্ষণগুলো ছিল আরেক ধরনের প্রার্থনা—শব্দহীন, কিন্তু আত্মাকে নরম করে দেওয়ার মতো শক্তিশালী এক উপলব্ধি।
উপসংহার: সফর নয়—এক মননশীল প্রত্যাবর্তন
সুগন্ধার সতেজ ধ্যানমগ্ন সকাল আর লাবণীর মায়াময় সন্ধ্যা—এই দুটি প্রহর মিলে প্রথম দিনটিকে গড়ে তুলল কেবল-ই একটি ভ্রমণের দিন নয়, বরং এক নিবিড় আত্মানুসন্ধান। সমুদ্রের অনন্ত বার্তা হৃদয়ে এভাবে গেঁথে গেল—সফর মানে কেবল ভৌগোলিক গন্তব্য নয়; সফর মানে নিজের অন্তরে ফেরার এক অনূভূতি। সৃষ্টি দেখে স্রষ্টার সন্ধান—এই উপলব্ধিই প্রকৃত যাত্রা।
এভাবেই প্রথম দিন শেষ হল—গভীর প্রশান্তি, বিনম্র কৃতজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিক আলোড়নের একটি ঘন মিশ্রণে; আর প্রতিটি ঢেউ যেন নীরবে বলল: “যাত্রা চলতেই থাকবে, কিন্তু প্রত্যাবর্তনই হবে তোমার সবচেয়ে বড় সঞ্চয়।”
Leave a Reply