
রাষ্ট্র কি তবে কেবল শক্তিমানেরই অভয়ারণ্য?
-আশরাফুল আলম তাজ
*প্রাককথন: সম্ভাবনার অপমৃত্যু
রাজনীতি—একদা যা বিবেচিত হতো ‘সম্ভাবনার শিল্পকলা’ রূপে, যার গর্ভে নিহিত ছিল সমাজবিবর্তনের অমোঘ প্রতিশ্রুতি, মহাকালের কষ্টিপাথরে আজ তা এক বিপন্ন অস্তিত্ব। জনসেবার যে পবিত্র বেদীমূলে একদিন মানবিকতার জয়গান গাওয়া হতো, আজ সেখানে আসীন দম্ভের কদর্য প্রতিমা। সময়ের নিষ্ঠুর ঘূর্ণাবর্তে রাজনীতির সংজ্ঞায় ঘটেছে এক বিয়োগান্তক রূপান্তর। ক্ষমতার নিরঙ্কুশ লোলুপতা আজ কেবল শাসনব্যবস্থাকেই গ্রাস করেনি, বরং সমাজের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত ভাষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও আত্মমর্যাদাবোধকেও করেছে বিষাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। বর্তমান সময় যেন এক নগ্নতার উৎসব—যেখানে পেশিশক্তিই একমাত্র আরাধ্য দেবতা, আর নৈতিকতা এক নির্বাসিত অতিথি।
*শব্দব্রহ্মের পতন: অবক্ষয়ের প্রথম সোপান
জর্জ অরওয়েল তাঁর কালজয়ী লেখনীতে দ্ব্যর্থহীনভাবে উচ্চারণ করেছিলেন—রাজনীতির পচন শুরু হয় ভাষার পচন দিয়ে। শব্দের পবিত্রতা যখন ধূলিলুণ্ঠিত হয়, তখন সংলাপের স্থান দখল করে আস্ফালন, কুৎসা আর স্থুল বিদ্রুপ। আজকের রাজনৈতিক মঞ্চে ভাষা আর গণতন্ত্রের বাহন নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে ত্রাস সৃষ্টির এক মারণাস্ত্র।
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এই ভাষিক সন্ত্রাসেরই এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রতিপক্ষ কিংবা নিরীহ অধীনস্থের প্রতি অশ্লীল বাক্যবাণ নিক্ষেপ আজ তথাকথিত ‘পৌরুষ’ বা ‘বীরত্ব’-এর স্মারকে পরিণত হয়েছে। যখন কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি নিজের কুরুচিকর আচরণের সাফাই গাইতে গিয়ে “মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি”-র মতো এক বীভৎস কৌতুককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন—এবং রাষ্ট্রযন্ত্র সেই অসার যুক্তিকেই ধ্রুবসত্য বলে মেনে নেয়—তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, সেখানে যুক্তি নির্বাসিত এবং অন্ধ আনুগত্যই একমাত্র যোগ্যতা। এই অপভাষা কেবল নিছক শব্দদূষণ নয়; এ এক পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসন।
*মেরুদণ্ডহীন প্রশাসন: ন্যায়বিচারের শ্মশানযাত্রা
ক্ষমতার আফিম যখন প্রশাসনিক কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে, তখন রক্ষক ও ভক্ষকের সীমারেখা মুছে যায়। আইনশৃঙ্খলার যে প্রহরীদের হওয়ার কথা ছিল নিরপেক্ষতার অতন্দ্র প্রহরী, আজ তারা শাসকের অঙ্গুলিহেলনে চালিত যান্ত্রিক পুতুল মাত্র।
সম্পাদকীয়র দর্পণে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। খোদ পুলিশকর্মীর পরিবারের নারীসদস্যদের প্রতি বর্ষিত কদর্য লাঞ্ছনাতেও প্রশাসন নির্বিকার, যেন এক গভীর কোমায় আচ্ছন্ন। উল্টো, অভিযোগকারীর আর্তনাদকে আতশ কাচের নিচে ফেলে কাটাছেঁড়া করা হয়, আর অভিযুক্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি পেয়ে যান ‘অক্সিজেন ঘাটতি’র এক অদ্ভুত ও অলৌকিক রক্ষাকবচ। যখন বিচারব্যবস্থার দ্বাররক্ষীরাই শাসকের ভ্রুকুটির ভয়ে কম্পমান, তখন ন্যায়বিচার পরিণত হয় শ্মশানের নিস্তব্ধ হাহাকারে। সাধারণ নাগরিকের মনে আজ একটাই প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি তবে কেবল শক্তিমানেরই অভয়ারণ্য?
অরওয়েলীয় দুঃস্বপ্ন ও দুর্নীতির চক্রব্যূহ
অরওয়েল দর্শনে আমরা দেখেছি, দুর্নীতি ও অপভাষা একে অপরের পরিপূরক—যেন এক বিষাক্ত মিথোজীবিতা। ক্ষমতার অলিন্দে আজ যে সংস্কৃতি লালিত হচ্ছে, তা সচেতনভাবেই এই চক্রব্যূহ রচনা করেছে। এই বৃত্তে প্রবেশের ছাড়পত্র হলো কদর্যতা, আর টিকে থাকার রসদ হলো নির্লজ্জতা।
শাসকের প্রশ্রয় এবং শীর্ষ নেতৃত্বের মৌন সম্মতি এই অপসংস্কৃতিকে নিয়মিত ‘অক্সিজেন’ জোগান দিয়ে যাচ্ছে। ফলে রাজনীতি আজ অরওয়েলের সেই ভীতিকর ভবিষ্যদ্বাণীরই এক জীবন্ত মঞ্চায়ন—যেখানে সত্যের অপলাপ এবং মিথ্যার বেসাতিই ক্ষমতার চাবিকাঠি। এটি এমন এক নেশাগস্ত বৃত্ত, যেখানে একবার প্রবেশ করলে বিবেকের মৃত্যু অবধারিত।
*গণতন্ত্রের মোড়কে নব্য-সামন্ততন্ত্র
গণতন্ত্রের আভিধানিক অর্থ হলো ‘জনগণের শাসন’, যেখানে শাসকের কোনো অস্তিত্ব নেই, আছেন কেবল ‘প্রতিনিধি’। কিন্তু ক্ষমতার মদিরা যখন শিরায় প্রবাহিত হয়, তখন সেই প্রতিনিধিরা নিজেদের ভাবেন একেকজন সামন্তপ্রভু। ভিন্নমতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা, নারীর প্রতি ভোগবাদী ও অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গি—এ সবই সেই স্বৈরাচারী মানসকাঠামোর ফসল।
বিস্ময় ও বেদনার বিষয় হলো—ক্ষমতার শীর্ষে নারীর অবস্থান সত্ত্বেও নারীর প্রতি এই অপমানজনক সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কারণ, রাজনীতি আদতে লিঙ্গনিরপেক্ষভাবে নিষ্ঠুর; ক্ষমতার এই দাবাখেলায় আবেগ বা অনুভূতির কোনো স্থান নেই, আছে কেবল অহংকারের একচ্ছত্র আধিপত্য।
*জনগণের মৌনতা: আত্মহননের নামান্তর
এই সমগ্র আখ্যানের সবচেয়ে ট্র্যাজিক অধ্যায় হলো—সমাজের সর্বগ্রাসী নীরবতা। এই স্তব্ধতা কি কেবল ভয়ের? নাকি সাময়িক সুবিধার আফিমে বুঁদ হয়ে থাকা এক পলায়নপর মনোবৃত্তি?
রাজনীতি যখন কেবল ‘ভাতা ও সুবিধা’র সংকীর্ণ লেনদেনে পর্যবসিত হয়, তখন নাগরিক সত্তা বিলুপ্ত হয়ে জন্ম নেয় এক ‘ভিক্ষাজীবী’ মানসিকতার। মানুষ ভুলে যায় যে, নীরবতাও এক প্রকার অপরাধ। শাসকের অন্যায়কে মুখ বুজে সহ্য করা মানেই সেই অন্যায়ের পরোক্ষ সহযোগী হয়ে ওঠা। ইতিহাস সাক্ষী, এই সুবিধাবাদী মৌনতা শেষ পর্যন্ত এক মহাদুর্যোগের অন্ধকারকেই আবাহন করে।
*ইতিকথা: পুনজাগরণের আহ্বান
ক্ষমতার এই নগ্ন দম্ভ আজ কেবল রাজনীতিকে কলুষিত করেনি, তা আমাদের মানবিক অস্তিত্বের মূলেই কুঠারাঘাত করেছে। আজ আমরা যে সংকটের মুখোমুখি, তা নিছক রাজনৈতিক পালাবদলের নয়—তা এক গভীর নৈতিক বিপর্যয়ের সংকট।
রাজনীতির হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন এক সাংস্কৃতিক ও চৈতনিক পুনজাগরণ। এই কলুষতার বৃত্ত ভাঙতে পারে একমাত্র জাগ্রত জনতা। যেদিন প্রতিটি নাগরিক ভয়ের শৃঙ্খল ভেঙে, সুবিধার মোহ ত্যাগ করে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করবে— “আমরা প্রভু চাই না, চাই সেবক; শাসক চাই না, চাই প্রতিনিধি”—সেদিনই ধসে পড়বে এই দম্ভের মিনার। নতুবা, এই অন্ধকারের শেষ কোথায়, তা মহাকালই জানে।
Leave a Reply