
গণভোটে রাষ্ট্রের পক্ষপাত: গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক
কলমে: আশরাফুল আলম তাজ
ভূমিকা: নিরপেক্ষতার অলীক দর্পণ
গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব তার পদ্ধতিতে নয়, বরং সেই পদ্ধতির স্বচ্ছতা ও নৈতিকতায়। ২০২৬ সালের আসন্ন গণভোটে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশ্য ‘হ্যাঁ’ ভোট-সমর্থন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্র যখন একাধারে গণভোটের আয়োজক এবং একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট উত্তরের প্রধান প্রচারক হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল নিরপেক্ষতার সর্বজনীন সংজ্ঞাকেই অস্বীকার করে না; বরং জনমতের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্য কায়েম করে। রাষ্ট্র যখন কোনো পক্ষ নেয়, তখন নাগরিকের ‘না’ বলার স্বাধীনতা আর সমান থাকে না। এই প্রবণতা শুধু একটি গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না—এটি সরাসরি গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়।
সংস্কারের অধিকার বনাম প্রচারণার আগ্রাসন
সরকারের দাবি—সংস্কারই তাদের ম্যান্ডেট। কিন্তু ম্যান্ডেট মানেই জনগণের বিবেচনাবোধের ওপর নিজস্ব পছন্দ চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার নয়। গণভোটের মূল সৌন্দর্য এখানেই যে, রাষ্ট্র এক ধাপ পেছনে সরে দাঁড়িয়ে জনগণকে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়। আয়োজক হিসেবে সরকারের দায়িত্ব ছিল প্রতিটি সংস্কারের পক্ষে ও বিপক্ষে সমান তথ্য, সমান সুযোগ ও সমান পরিসর নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন জেলা প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে একতরফা প্রচারণা চালানো হয়, তখন রাষ্ট্র আর আম্পায়ার থাকে না—সে নিজেই সবচেয়ে শক্তিশালী খেলোয়াড়ে পরিণত হয়। যে হাত ভোট গণনা করবে, সেই হাত যদি আগেই ভোটারের চিন্তাকে নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেয়, তবে সেই রায়ের নৈতিক ভিত্তি অবধারিতভাবেই ভেঙে পড়ে। সংস্কার প্রস্তাব করা রাষ্ট্রের পদ্ধতিগত দায়িত্ব, কিন্তু সেই সংস্কারের বিপণন করা রাষ্ট্রের নৈতিক এখতিয়ার নয়।
রাষ্ট্রের নীরবতা: আভিজাত্য না কি কাপুরুষতা?
সরকারি ভাষ্যে বলা হচ্ছে—এই সংকটময় সময়ে নীরবতা হবে দায়িত্বহীনতা। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অমোঘ সত্য হলো, রাষ্ট্রের নীরবতাই তার সবচেয়ে শক্তিশালী অলঙ্কার। রাষ্ট্র কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয় যে তার ব্যক্তিগত পছন্দ থাকবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি শব্দের সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রশাসন, আইন, পুলিশ এবং বলপ্রয়োগের দীর্ঘ ইতিহাস। ফলে রাষ্ট্র যখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বলে, তখন সেই শব্দ আর পরামর্শ থাকে না—তা অনিবার্যভাবে আজ্ঞায় রূপান্তরিত হয়। এই নীরবতা কোনো কাপুরুষতা নয়; এটি ক্ষমতার ওপর স্বেচ্ছা সংযমের এক অনন্য আভিজাত্য। যেখানে রাষ্ট্র কথা বলে, সেখানে নাগরিকের কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকভাবেই ক্ষীণ হয়ে আসে—এটাই ক্ষমতার বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক নজিরের বুদ্ধিবৃত্তিক ফাঁদ
যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের উদাহরণ টেনে এই প্রচারণাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা একটি সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তি। ওই দেশগুলোর সরকার ছিল নির্বাচিত ও রাজনৈতিকভাবে পক্ষধারী। তারা নির্দিষ্ট জনমতের প্রতিনিধি হিসেবেই অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মূল বৈধতাই হলো তার অরাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। তাদের একমাত্র মূলধন জনগণের নিঃশর্ত আস্থা। যখন আয়োজক নিজেই কোনো একটি পক্ষের জার্সি গায়ে চাপিয়ে মাঠে নামে, তখন সেই খেলা আর গণতান্ত্রিক থাকে না—তা পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকাতায় সাজানো এক প্রহসনে।
জেলা প্রশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেষণা
সরকারি প্রচারণাকে ‘জনগণকে সচেতন করা’ নামে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামো যখন একতরফা প্রচার চালায়, তখন তা আর সচেতনতা থাকে না—তা হয়ে ওঠে সম্মতি উৎপাদনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া । যে সমাজে ভিন্নমত পোষণ করাকে সহজেই ‘সংস্কারবিরোধী’ বা ‘প্রগতিবিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়, সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রচারণার বিপরীতে দাঁড়ানো একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য প্রায় অসম্ভব। গণতন্ত্র কেবল ব্যালট পেপারে সিল মারা নয়; গণতন্ত্র হলো ভয়হীন চিত্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক মুক্ত বাতাবরণ।
উপসংহার: ইতিহাসের অমোঘ রায়
শেষ পর্যন্ত এই বিতর্ক ‘হ্যাঁ’ না ‘না’ ভোটের নয়। প্রশ্নটি আরও গভীর ও মৌলিক—রাষ্ট্র কি নাগরিকের বিচারবুদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার রাখে? যদি রাষ্ট্রই ঠিক করে দেয় কোনটি সঠিক, তবে এই ভোটের আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজনই বা কী? ইতিহাস সাক্ষয় দেয়—যারা ক্ষমতার ভর করে প্রচারণার মাধ্যমে জনমতকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ঢালতে চেয়েছে, তারা হয়তো ক্ষণস্থায়ী জয় পেয়েছে, কিন্তু ইতিহাসের দরবারে চিহ্নিত হয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক হিসেবেই। গণভোটে রাষ্ট্রের নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়; এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ প্রতিশ্রুতি। রাষ্ট্রকে তার সিংহাসনে বসে থাকতে দিন, তাকে প্রচারণার ডুগডুগি হাতে রাস্তায় নামাবেন না। কারণ, যে সংস্কারকে প্রচারণার জোরে গিলিয়ে দিতে হয়, সেই সংস্কারের নৈতিক আয়ু কখনোই দীর্ঘ হয় না।
(#গণভোট২০২৬ #বাংলাদেশেরগণতন্ত্র #রাষ্ট্রেরনিরপেক্ষতা #নাগরিকভাবনা #আশরাফুলআলমতাজ #প্রথমআলো)
Leave a Reply