
হাদীর মৃত্যু ও আগুনের রাজনীতি: বিবেকের কাঠগড়ায় রাষ্ট্র -আশরাফুল আলম তাজ
(শব্দে সময়কে প্রশ্নকারী এক নাগরিক কণ্ঠ)
২০ ডিসেম্বর ২০২৫
একটি মৃত্যু যখন কেবল একটি প্রাণের প্রস্থান না হয়ে বরং সময়ের হৃৎপিণ্ডে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়, তখন ইতিহাস থমকে যেতে বাধ্য হয়। কোনো কোনো মহাপ্রয়াণ কেবল শোকের নয়, বরং এক মহাপ্রশ্নের জন্ম দেয়—যা সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের ওপর নিক্ষিপ্ত এক নির্মম আলোকপাত। তরুণ হাদীর এই অকাল মৃত্যু আজ তেমনই এক কালবেলা হয়ে আমাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে; যেন মহাকালের বুক চিরে আর্তনাদ করে উঠছে এক চিরন্তন জিজ্ঞাসা—
“তোমরা কি গন্তব্য হারিয়ে ফেলেছ?”
এই অনভিপ্রেত মৃত্যুর বিপ্রতীপে আমরা যা দেখলাম, তা কেবল একপাক্ষিক শোক নয়—বরং এক বীভৎস আগুনের মহড়া। প্রথম আলো থেকে ডেইলি স্টার, ছায়ানট থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের স্মারক স্থাপত্য—সবই যেন এক অন্ধ প্রতিহিংসার অগ্নিগ্রাসে গ্রাসিত হওয়ার মুখে দাঁড়াল। এই ধ্বংসলীলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত চিন্তার স্বাধীনতার ওপর আঘাত, আমাদের সম্মিলিত স্মৃতির ওপর সংঘটিত এক চরম অন্যায়ের দৃশ্যমান দলিল।
শোকের সংজ্ঞায়ন: যখন যুক্তি হারায় দিশা
শোক মানুষের আদিম ও অকৃত্রিম আবেগ। বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
কিন্তু সেই শোক যখন উন্মত্ততায় রূপান্তরিত হয়, আর ক্ষোভ যখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আগুনের ভাষা ধারণ করে—তখন তা আর ন্যায়ের অন্বেষা থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে এক আত্মঘাতী প্রতিশোধ।
সংবাদপত্র কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের নয়—তা সমাজের দর্পণ। সংস্কৃতি কোনো জড় বস্তু নয়—তা জাতির আত্মপরিচয়ের ভাষা। আর ধানমন্ডি ৩২ কিংবা ছায়ানটের মতো স্থাপনাগুলো কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এগুলো আমাদের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও ঐতিহ্যের ধারক।
এই প্রতীকগুলোর ওপর আঘাত করা মানে নিজেরই আয়নায় পাথর নিক্ষেপ করা, নিজেরই উত্তরপুরুষের জন্য এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ রেখে যাওয়া।
আগুনের রাজনীতি: ন্যায় কি দহনে বাঁচে?
সভ্যতা আমাদের শিখিয়েছে—জিঘাংসা কখনো ন্যায়ের বিকল্প হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো অসংগতির প্রতিবাদ হতে হয় যুক্তির মাধ্যমে, আইনের শাসনের ভেতর দিয়ে।
গণমাধ্যমের কার্যালয়ে যখন আগুন জ্বলে, তখন মূলত আমরা সত্যের কণ্ঠকেই পুড়িয়ে ফেলি। সংস্কৃতির প্রাঙ্গণে যখন ত্রাস নামে, তখন আমরা প্রকারান্তরে নিজেদের আত্মিক বিকাশকেই রুদ্ধ করি। আগুনের শিখায় কখনো ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয় না—সেখানে কেবল ধ্বংসের ছাই জমে।
অতএব এই আগুনের রাজনীতি কোনো যুক্তিতেই সংগত নয়—না নৈতিকভাবে, না আইনগতভাবে, না সভ্যতার বিচারে।
রাষ্ট্রের নীরবতা: ব্যর্থতার নামান্তর?
সবচেয়ে গভীর বেদনার জায়গাটি এখানেই—রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা।
রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; রাষ্ট্র হলো নাগরিকের নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুত মুখ।
যখন জনরোষের নামে প্রতিষ্ঠান পুড়তে থাকে, সংস্কৃতির কেন্দ্রগুলো আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায়, আর রাষ্ট্র যদি তখন কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়—সে নীরবতা আর নির্দোষ থাকে না; তা হয়ে ওঠে পরোক্ষ সম্মতির ভাষা।
আইনের আদালতে অপরাধীদের বিচার হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের আদালতে প্রশ্ন আরও নির্মম—
এই অরাজকতার সময়ে রাষ্ট্র কেন তার অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলো?
কেন আগাম প্রতিরোধের বর্ম ছিন্ন করে আগুনের জিহ্বা স্পর্শ করল আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে?
রাষ্ট্র যখন তার নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই দায় কোনো রাজনৈতিক বয়ানে মোচন করা যায় না।
শেষ কথা: বিবেকের দায়বদ্ধতা
হাদীর মৃত্যু আমাদের এক নির্মম আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেই আয়নায় আজ আমাদের দৈন্য ও বিচ্যুতিই স্পষ্ট। আমরা কি এমন এক দেশ চেয়েছি—যেখানে শোক কেবল আগুনের ভাষা বোঝে? যেখানে রাষ্ট্রের নীরবতা অপরাধীর সাহস বাড়িয়ে দেয়?
ইতিহাসের সাক্ষ্য নির্মম ও অনিবার্য—যে জাতি নিজের সংবাদপত্র ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সে জাতি অচিরেই তার মেরুদণ্ড হারায়।
হাদীর স্মৃতির প্রতি প্রকৃত সম্মান তখনই জানানো হবে, যখন আমরা প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচারকে বেছে নেব, আগুনের বদলে বিবেকের প্রদীপ জ্বালাব।
আগুন নয়—সত্য ও সুন্দরের পথই হোক আমাদের উত্তরণের একমাত্র পাথেয়।
Leave a Reply