
নক্ষত্রের মহাপ্রস্থান: মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে এক বিশাল শূন্যতার হাহাকার
-আশরাফুল আলম তাজ
“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
পৃথিবীর বুকে কিছু মানুষের প্রস্থান কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, বরং একটি যুগের পরিসমাপ্তি। পারস্যের আধ্যাত্মিক আকাশ থেকে আজ যে নক্ষত্রটি খসে পড়ল, তার দীপ্তি কেবল তেহরানের অলিগলিতে নয়, বরং গোটা মুসলিম জাহানের প্রতিটি সচেতন হৃদয়ে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ আল-উযমা সাইয়্যেদ আলী খামেনীর শাহাদাত বরণ সমকালীন ইসলামের ইতিহাসে এক অপূরণীয় বিয়োগগাথা।
এক অদম্য সিপাহসালার ও আধ্যাত্মিক রাহবার
বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর আত্মমর্যাদার এক অতন্দ্র প্রহরী। যখন বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মুসলিম দেশগুলোর মানচিত্র পুনর্গঠনে মত্ত, তখন তিনি তেহরানের নির্জন কক্ষ থেকে আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা আর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অভেদ্য বর্ম তৈরি করেছিলেন।
তাঁর নেতৃত্বে ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং আধুনিক ‘প্রতিরোধ সংস্কৃতির’ এক বৈশ্বিক প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। শত্রুপক্ষের হাজারো ষড়যন্ত্র আর নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল ছিন্ন করে তিনি যেভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে কক্ষপথে ধরে রেখেছিলেন, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে থাকবে।
হৃদয়স্পর্শী শূন্যতা ও উম্মাহর হাহাকার
ফিলিস্তিনের মজলুম জনতা থেকে শুরু করে লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনের নিপীড়িত মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক নির্ভরতার আকাশ। তাঁর প্রয়াণে আজ গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে শুরু করে তেহরানের রাজপথ পর্যন্ত যে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, তা এক গভীর এতিমত্বের হাহাকার।
তেহরানের রাস্তায় নারীদের হাতে তাঁর ছবি নিয়ে কান্নার রোল এই শূন্যতারই প্রতিচ্ছবি।
মুসলিম বিশ্বের হৃদস্পন্দনে তিনি এমন এক স্পন্দন তৈরি করেছিলেন, যা সাম্রাজ্যবাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাত। আজ সেই অভিভাবকতুল্য কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির আকাশে এক কালো মেঘের ঘনঘটা দেখা দিয়েছে।
যুক্তি ও প্রজ্ঞার শানিত প্রতিচ্ছবি
শোকের এই আবহেও তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়ে যায় যে, প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং তা মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক। তিনি তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন যে, ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয় ঘটিয়ে কীভাবে একটি জাতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।
তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল যেন পারস্যের সূক্ষ্ম কারুকাজ—শান্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী।
পরিশেষ: ইতিহাসের পাতায় অক্ষয় জ্যোতি
দেহ নশ্বর, কিন্তু আদর্শ অবিনশ্বর। খামেনী আজ ইতিহাসের অংশ, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ‘বদর ও খন্দকের’ চেতনা মুসলিম যুবসমাজের ধমনীতে চিরকাল প্রবাহিত হবে।
কবির ভাষায় বলতে হয়—
“মৃত্যু তো কেবল একটি পুল, যা বন্ধুকে বন্ধুর সাথে মিলিয়ে দেয়।”
আজকের এই ক্রান্তিলগ্নে আমরা মহান আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনা করি, তিনি যেন এই বিশাল শূন্যতা পূরণে মুসলিম উম্মাহকে ধৈর্য ও নতুন নেতৃত্বের দিশা দান করেন।
হে রাব্বুল আলামিন, আপনার এই একনিষ্ঠ খাদেমের শাহাদাত কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন।
#আয়াতুল্লাহখামেনী #মুসলিমউম্মাহ #শোকবার্তা #প্রতিরোধসংস্কৃতি #আশরাফুলআলমতাজ
Leave a Reply