
{প্রাক-কথন
ইতিহাসের ললাটে একাত্তর আমাদের অমর মহাকাব্য—একটি জাতির জন্মের রক্তিম আখ্যান। আর চব্বিশের জুলাই সেই মহাকাব্যের পথ ধরে হেঁটে চলা উত্তরসূরিদের এক সাহসী আত্মশুদ্ধি। একটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি, অন্যটি সেই ভিত্তি রক্ষার এক শাণিত সংস্কার। একাত্তরের অনন্যতাকে অক্ষুণ্ণ রেখে বর্তমানের দ্রোহকে চিনে নেওয়ার এক ক্ষুদ্র প্রয়াস— ‘মহাকালের তর্জনি’। এটি কেবল কবিতা নয়, বরং ইতিহাসের সত্য ও দায়বদ্ধতার এক কাব্যিক দলিল।}
মহাকালের তর্জনি
শব্দে সময়কে প্রশ্নকারী এক নাগরিক কন্ঠ
— আশরাফুল আলম তাজ
বর্তমান কি কেবল অতীতের এক বিবর্ণ প্রতিবিম্ব,
নাকি ইতিহাসের অগ্নিগর্ভে লালিত
দুই অবিনাশী আগ্নেয়গিরির অনিবার্য সংঘাত?
একাত্তর—
সে কোনো নিছক কালখণ্ড নয়;
সে এক নক্ষত্রবিদ্ধ আদিম হাহাকার।
একটি ভূখণ্ডের প্রসববেদনার সেই রক্তিম রজনী—
যেখানে ধাত্রী ছিল ত্রিশ লক্ষ শহীদের উষ্ণ রুধিরধারা,
আর জন্মলগ্নের আর্তনাদ ছাপিয়ে উঠেছিল
স্বাধীনতার প্রথম বজ্রনির্ঘোষ।
সেদিন শব্দের অলংকার ছিল না—
ছিল কামানের দানবীয় গর্জন,
জননীর আঁচলে লেপ্টে থাকা বারুদের তীব্র ঘ্রাণ,
আর পদ্মা–মেঘনা–যমুনার কল্লোলে
স্বজনহারানো রক্তের অনন্ত হিল্লোল।
ইতিহাসের বিধাতা সেদিন জানতেন—
এ কেবল মানচিত্রের রেখা বদলের তুচ্ছ সংঘাত নয়;
এ ছিল বাঙালির ‘স্বত্ব’ ও ‘সত্তা’ অন্বেষণের
এক অগ্নিদীক্ষিত মহাকাব্য।
সে ত্যাগে ছিল স্বর্গের সৌরভ,
সে অশ্রুতে ছিল সার্বভৌমত্বের লবণাক্ত স্বাদ।
একাত্তর ছিল সেই অগ্নিস্নাত ঊষা—
যা তিমির গ্রাস করে
জন্ম দিয়েছিল এক অজর, অব্যয় সূর্য।
অতঃপর কালচক্রের আবর্তনে—
মহাকালের ললাটে খোদাই হলো
আরেকটি তারিখ— চব্বিশের জুলাই।
এ কোনো নতুন ভূখণ্ডের প্রসববেদনা নয়,
নয় কোনো নব-পতাকা উত্তোলনের উন্মত্ত হুঙ্কার;
এ যেন নির্মিত রাষ্ট্রের জীর্ণ কপালে
এক শাণিত ও অনিবার্য করাঘাত।
চব্বিশের জুলাই ছিল নাগরিক অসন্তোষের
এক পারমাণবিক দহন—
যেখানে রাজপথ ও ডিজিটাল প্রাচীর
তারুণ্যের দগ্ধ নিঃশ্বাসে একাকার।
এ ছিল সংস্কারের এক রূঢ় রণধ্বনি—
রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডে জমে ওঠা
দীর্ঘদিনের পঙ্কিল শ্যাওলা
উপড়ে ফেলার এক নির্ভীক উচ্চারণ।
এখানে বুলেট ছিল লক্ষ্যভেদী,
কিন্তু ললাটের আকাশ ছিল ভিন্ন;
এখানে শ্লোগান ছিল গগনবিদারী,
কিন্তু গন্তব্য ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের নবায়ন—
নতুন রাষ্ট্রসৃজন নয়।
হে ইতিহাসের চতুর তাত্ত্বিক, শোনো—
একাত্তর আর চব্বিশকে এক পাল্লায় মাপা
কি নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক দারিদ্র্য নয়?
একাত্তর এক কালজয়ী মহীরুহ—
যার শিকড় প্রোথিত
আমাদের জাতিসত্তার অতল গহ্বরে;
আর চব্বিশ হলো সেই বৃক্ষের গায়ে
জেঁকে বসা বিষাক্ত পরগাছা
উপড়ে ফেলার এক অদম্য সংকল্প।
একাত্তর আমাদের জন্মদাত্রী জননী,
আর চব্বিশ—
সেই জননীর সন্তানদের
আত্মশুদ্ধির এক কঠোর আয়োজন।
একটি ছিল অস্তিত্বের আদিম সংগ্রাম,
অন্যটি মর্যাদার আধুনিক দাবি।
একাত্তরের আত্মদান হিমালয়স্পর্শী—
যেখানে জীবন বিসর্জন ছিল
এক সার্বভৌম অঙ্গীকার।
চব্বিশের ক্ষোভও অনস্বীকার্য—
তার তারুণ্য তীক্ষ্ণ, তার স্পর্ধা লেলিহান;
তবু কি তা ত্রিশ লক্ষ প্রাণের
মহাসমুদ্রের সমতুল্য হতে পারে?
কদাচ নয়।
যারা এই দুই অধ্যায়কে একীভূত করার ধৃষ্টতা দেখায়,
তারা ইতিহাসের ললাটে লেপন করে
এক কলঙ্কিত বিভ্রান্তির প্রলেপ।
অতএব আজ এই চরাচরে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত হোক—
একাত্তর আমাদের চিরন্তন ধ্রুবতারা,
যার আলোয় আমরা প্রথম পথ চিনেছি।
আর চব্বিশ হলো সেই রাজপথের
ধূলিকণা ঝেড়ে ফেলার এক প্রয়োজনীয় ঝড়।
একটি ছিল জাতি গঠনের অমোঘ স্থাপত্য,
অন্যটি সেই স্থাপত্যের জীর্ণ ও ভঙ্গুর সংস্কার।
একাত্তর আমাদের দিয়েছে ‘গৃহ’,
চব্বিশ শিখিয়েছে
সেই ‘গৃহের নিরাপত্তা’।
ইতিহাসের পঞ্জিকায়
একাত্তর থাকবে অমর উপাখ্যান হয়ে,
আর চব্বিশ থাকবে এক শাণিত সতর্কবাণী—
যাতে স্বাধীনতার সূর্য
কোনো মদমত্ত রাহুর গ্রাসে
আর কখনো বিলীন না হয়।
আমরা স্মৃতির গভীর অতলান্ত থেকে
আজও তুলে আনি
একাত্তরের সেই রুদ্র তর্জনি,
আর বর্তমানের রাজপথে খুঁজে পাই
তারই অবিনাশী স্পন্দন।
তবু ধ্রুব সত্য একটাই—
একাত্তর অনন্য,
একাত্তর অপ্রতিম,
একাত্তরই বাঙালির
শাশ্বত ও সার্বভৌম পরিচয়।
বাকি সব ইতিহাস
কেবল সেই মহাকাব্যের
সশ্রদ্ধ পাদটীকা মাত্র।
Leave a Reply