
রক্তের আল্পনায় ক্ষমতার জ্যামিতি: সমকালীন দহনের ব্যবচ্ছেদ, আশরাফুল আলম তাজ
(শব্দে সময়কে প্রশ্নকারী এক নাগরিক কণ্ঠ)
ইতিহাসের এক কণ্টকাকীর্ণ ও কুহেলিকাময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ আমরা এক বিভীষিকাময় নাট্যমঞ্চের নির্বাক সাক্ষী। সময়ের আবর্তে মঞ্চের কুশীলব বদলায়, দৃশ্যপটের যবনিকা উত্তোলিত ও পতন ঘটে, কিন্তু রাজপথের সেই তপ্ত শোণিতধারা—সেগুলো চিরকালই এক আদিম ও শাশ্বত হাহাকারের গল্প বলে। বাংলাদেশের সমকালীন আকাশ আজ প্রোপাগান্ডার কৃষ্ণমেঘে আচ্ছন্ন; সত্যের অরুণোদয় ঘটার পূর্বেই মিথ্যের কুয়াশা তাকে নিভৃতে গ্রাস করে। এখানে একটি প্রাণের অকালপ্রয়াণ কেবল একটি বিয়োগান্তক ব্যক্তিগত শোক নয়—এটি হয়ে ওঠে ক্ষমতার নব-সমীকরণ রচনার এক নির্দয় পটভূমি। এই জনপদে ‘লাশ’ আজ রাজনীতির সর্বাধিক প্রতাপশালী ও ব্যবহৃত বিনিময় মুদ্রা।
রাজনীতির দাবার ঘুঁটি ও অদৃশ্য সুতো
অস্থিরতার এই ধূসর প্রহরে কোনো মৃত্যুই আর নিছক দৈব-দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য হয় না। প্রতিটি তপ্ত বুলেট এবং প্রতিটি রক্তাক্ত পতনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকে এক নিপুণ ও অদৃশ্য চিত্রনাট্যকারের কারুকাজ। ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দেখা যায়—শান্ত জনপদ অকস্মাৎ রণক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়। কোনো এক প্রান্তিক তরুণের নিথর দেহ যখন হাসপাতালের হিমঘরে হিমায়িত হয়, ঠিক তখনই ডিজিটাল জগতের মায়াবী গোলকধাঁধায় শুরু হয় সেই লাশের বাণিজ্যিক ব্যবচ্ছেদ। ঘাতকের পরিচয় উন্মোচনের আগেই নির্ধারিত হয়ে যায় তার রাজনৈতিক পরিচয়। তড়িৎ রায় ঘোষণার এই সংস্কৃতি আসলে ন্যায়বিচারের অন্বেষণ নয়, বরং জনমতের নাড়ি স্পন্দন নিয়ন্ত্রণের এক সুপরিকল্পিত ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস’।
প্রোপাগান্ডার মায়াজাল ও উৎপাদিত বীরত্ব
বর্তমান লড়াই যতটা না ধুলোবালির রাজপথে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রজ্জ্বলিত স্মার্টফোনের নীল আলোকচ্ছটায়। এখানে কয়েক পলকে নির্মিত হয় কৃত্রিম নায়ক কিংবা ঘৃণ্য খলনায়ক। যাকে গতকাল পর্যন্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে, আজ তাকেই লাশের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে বিলাপের অভিনয়ে নিমগ্ন হতে দেখা যায়। এই আকস্মিক নৈতিক ভোলবদল প্রমাণ করে—শোক এখানে আত্মিক অনুভূতি নয়, বরং আগামী দিনের ক্ষমতার এক চতুর ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। মিথ্যে বীরত্ব ও ‘ম্যানুফ্যাকচার্ড হিরোইজম’-এর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় বলিপ্রদত্ত হয় সাধারণ মানুষের সহজ-সরল আবেগ ও সহজাত বিচারবোধ। বিপ্লবের পবিত্র মুখোশ পরিধান করে যখন কেউ ‘কবর রচনা’র আস্ফালন করে, তখন বুঝতে হয়—এই কণ্ঠস্বর কোনো শোষিত জনতার নয়, বরং এটি নেপথ্যের গদিলোভী উচ্চাভিলাষী শক্তির এক দানবীয় প্রতিধ্বনি।
অন্ধ ঘৃণা ও প্রতিবেশী-বিদ্বেষের অপরাজনীতি
নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা আদর্শিক দৈন্য ঢাকতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে বলির পাঁঠা বানানো এই ভূখণ্ডের এক প্রাচীন ব্যাধি। কোনো অপরাধী সীমান্ত অতিক্রম করলে তাকে আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সদিচ্ছার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক ও ভৌগোলিক ঘৃণার দাবানল প্রজ্বলন করা। এই বিষবাষ্প কেবল কূটনৈতিক সোপানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং দেশের অভ্যন্তরীণ সংহতি এবং সংখ্যালঘু ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সহিংসতাকে এক ধরণের লৈঙ্গিক বৈধতা দান করে। নিরপরাধের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে তাকে ‘বিপ্লব’ নামে অভিষিক্ত করা আত্মপ্রবঞ্চনার এক নিকৃষ্টতম মহড়া—এটি কোনো সংস্কার নয়, বরং মধ্যযুগীয় বর্বরতার এক আধুনিক সংস্করণ মাত্র।
লাশের রাজনীতি ও আগামীর অশনিসংকেত
মহাকালের সাক্ষী ইতিহাস বারবার এই সত্যটিই উন্মোচন করেছে—যারা লাশের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে রাজসিংহাসনের স্বপ্ন দেখে, তাদের তৃষ্ণা কখনো মিটবার নয়। এক ‘হাদী’র রক্তে তাদের লোলুপ চিত্ত শান্ত হয় না; তারা অবিরাম অন্বেষণ করে আরও বহু হাদির নিথর দেহ। ক্ষমতার এই তিক্ত স্বাদ আস্বাদনের লালসায় আজ বিপন্ন আমাদের সোনালী তারুণ্য। যে কোমল হাতে ধ্রুপদী সাহিত্য কিংবা বিজ্ঞানের গ্রন্থ থাকার কথা ছিল, সেই হাতে সুকৌশলে তুলে দেওয়া হচ্ছে ঘৃণার অগ্নিমশাল। ধর্ম আর আবেগের সংমিশ্রণে তৈরি এই আদিম ও অমোঘ অস্ত্র ব্যবহার করে তরুণ প্রজন্মকে যেভাবে উগ্রতার অন্ধকূপে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, তাতে এক প্রলয়ংকরী ভবিষ্যতের পদধ্বনি স্পষ্ট শ্রুত হয়।
উপসংহার
সময় সমাগত—রক্তরঞ্জিত দাবার এই কুটিল চালগুলো চিনে নেওয়ার। বিপ্লবের নামে যারা অরাজকতার বীজ বপন করে এবং মৃত্যুকে পুঁজি করে ক্ষমতার সওদাগরি করে—তারা কখনো এই মৃত্তিকাসংলগ্ন মানুষের প্রকৃত সুহৃদ হতে পারে না। আবেগের মায়াবী চোরাস্রোতে পথ হারানোর বদলে আমাদের আজ বিবেক ও বিচারবুদ্ধির ধ্রুবতারাকে অনুসরণ করতে হবে। বিস্মৃত হলে চলবে না যে, শকুনের প্রার্থনা কখনো ধরণীর জন্য কল্যাণ বা আশীর্বাদ বয়ে আনে না। আজ যদি আমরা এই নির্লজ্জ ‘লাশ-ব্যবসা’র বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে সজাগ না হই, তবে আগামী দিনে এই মৃতদেহের মিছিল কেবল দীর্ঘতরই হবে—আর আমরা ললাটে কলঙ্ক তিলক এঁকে তার নির্বাক সহযাত্রী হয়েই ইতিহাসে টিকে থাকব।
Leave a Reply