
হযরত হাবিব নোহ আল-হাবশি রহঃ এর জীবনী ও কারামত। সংগ্রহেঃ মহররম হোসেন
আপনি কি কখনও চাঙ্গি বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার পথে তানজং পাগারের কাছে ইস্ট কোস্ট পার্কওয়ে (ECP) মহাসড়কের সেতুর শেষ প্রান্তে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় সেখানকার বাঁকটি লক্ষ্য করেছেন? সিঙ্গাপুরের অত্যন্ত অভিজাত বানিজ্যিক এলাকার সুউচ্চ ভবনগুলোর মাঝে মহাসড়ক থেকেই সবুজ ও সোনালি রঙের একটি দরগাহ শরীফ (মাকাম) স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এখানেই শায়িত আছেন আল্লাহর মহান ওলী হাবিব নোহ আল-হাবশি রহমতুল্লাহি আলাইহি, একজন শ্রদ্ধেয় মুসলিম সাধক, যিনি ১৮৬৬ সালের ২৭ জুলাই ওফাত লাভ করেন।
হাবিব নোহ আল-হাবশি রহমতুল্লাহি আলাইহি ১৭৮৮ সালে সুমাত্রার পালেমবাং থেকে পেনাংগামী একটি জাহাজে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮১৯ সালে—অর্থাৎ ৩১ বছর বয়সে—স্যার স্ট্যামফোর্ড র্যাফেলসের সিঙ্গাপুরে আগমনের ঠিক পরপরই তিনিও সেখানে আসেন এবং জীবনের বাকি সময় সেখানেই অতিবাহিত করে ওফাত লাভ করেন। এ কারণে তিনি সিঙ্গাপুরের ইতিহাসে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন এবং তাঁর প্রভাব আজও বিদ্যমান।
প্রতি বছর মুসলমানরা যাকে ‘হাওল’ পবিত্র ওরশ মোবারক বলে অভিহিত করে, সেই উপলক্ষে হাজার হাজার দর্শনার্থী ‘মাকাম হাবিব নোহ’-তে সমবেত হন। এই দর্শনার্থীদের মধ্যে কেবল সিঙ্গাপুরের মুসলমানরাই নন, বরং সিঙ্গাপুর ও এর বাইরের নানা প্রান্ত থেকে আসা মুসলমান ও অ-মুসলমানরাও অন্তর্ভুক্ত থাকেন। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক আলেম ও দর্শনার্থীর সমাগম সামাল দিতে বিশেষ তাঁবুতে প্যানডেলের প্রয়োজন হয়; কারণ তাঁর সমাধির পাশেই অবস্থিত মসজিদটিতে (হাজি মুহাম্মদ সালেহ মসজিদ) একসঙ্গে মাত্র ৯০০ মানুষের স্থান সংকুলান হয়।
হাবিব নোহ আল-হাবশি রহঃ এর জীবনঃ
জীবদ্দশায় হাবিব নোহ আল-হাবশি রহমতুল্লাহি আলাইহি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের প্রতি—বিশেষ করে শিশু ও এতিমদের প্রতি—অপার মমতা ও উদারতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি সমাজের মানুষকে নিয়মিত উপদেশ ও দিকনির্দেশনা দিতেন এবং এ কাজের জন্য মালয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে তরিকতের সফর করতেন। মানুষ তাঁকে অত্যন্ত আধ্যাত্মিক ও ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করতেন; তারা তাদের নবজাতকদের তাঁর কাছে নিয়ে আসত যাতে তিনি ‘তাহনিক’ (tahnik) নামক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের জন্য দোয়া বা আশীর্বাদ করতে পারেন। ‘তাহনিক’ হলো ইসলামি ঐতিহ্যের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রথা, যেখানে নবজাতককে সামান্য মিষ্টি কিছু—সাধারণত খেজুরের রস—খাওয়ানো হয় এবং তার জন্য দোয়া করা হয়। হাবিব নোহ পরলোকগমন করলেও মানুষ আজও আশীর্বাদ লাভের আশায় তাদের নবজাতকদের তাঁর মাকাম বা সমাধিস্থলে নিয়ে আসে। উল্লেখ্য, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়েও একই অনুষ্ঠানের জন্য শিশুদের তাঁর কাছে নিয়ে আসা হতো। হাবিব নোহ ছিলেন মহানবী (সা.)-এর প্রত্যক্ষ বংশধর; তিনি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেই নয়, বরং তাঁর মহৎ চরিত্র ও মানুষের সাথে আচরণের ক্ষেত্রেও মহানবীর আদর্শ অনুসরণ করতেন।
হাবিব নোহ চীনা অপেরা উপভোগ করতেন এবং প্রায়শই এসব অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে বসে তা দেখতেন। যদিও তিনি সেই ভাষা বুঝতেন না, তবুও তিনি বলতেন যে এই পরিবেশনাগুলো থেকে তিনি বিশেষ অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতেন!
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাবিব নোহ তাঁর ধর্মপরায়ণতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন; তিনি সারারাত জেগে ভোর পর্যন্ত ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকতেন। তিনি নিয়মিত কবরস্থান পরিদর্শন করতেন এবং মৃতদের জন্য দোয়া করতেন। তাঁর জীবনে এমন অনেক অলৌকিক ঘটনা বা কারামতের কথা প্রচলিত ছিল, যা প্রত্যক্ষদর্শীরা বা সমসাময়িক ব্যক্তিরা জানতেন। তিনি বিশেষ করে শিশুদের রোগ নিরাময়কারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন; এমন অনেক ঘটনা শোনা যায় যেখানে অসুস্থ শিশুদের শরীরে হাত বুলিয়ে দেওয়ার ফলে তারা সুস্থ হয়ে উঠেছিল।
তাঁর আরেকটি অলৌকিক ক্ষমতা ছিল একই সময়ে একাধিক স্থানে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা। একটি বিখ্যাত ঘটনা হলো, মক্কায় হজ পালনে যাত্রারত এক ব্যক্তিকে হাবিব নোহ বলেছিলেন যে তাঁদের সেখানে দেখা হবে। সেই ব্যক্তি যখন মক্কায় পৌঁছালেন, তখন হাবিব নোহ স্বয়ং তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন—অথচ সবাই জানত যে তিনি সশরীরে সিঙ্গাপুর ত্যাগ করে মক্কায় যাননি।
অজানা বিষয় সম্পর্কে আগাম ধারণা বা পূর্বলক্ষণ বুঝতে পারার বিশেষ ক্ষমতাও হাবিব নোহের ছিল। একবার এক ব্যক্তি তাঁর পরিবারের সাথে দেখা করতে ভারতে গিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, যদি তিনি নিরাপদে এই সফর সম্পন্ন করে সিঙ্গাপুরে ফিরে আসতে পারেন, তবে হাবিব নোহকে একটি উপহার দেবেন। সিঙ্গাপুরে পৌঁছে তিনি অবাক হয়ে দেখলেন যে, হাবিব নোহ আগেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন।
হাবিব নোহ আল-হাবশি রহমতুল্লাহি আলাইহি এর ওফাত
১৮৬৬ সালে ৭৮ বছর বয়সে হাবিব নোহ মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সর্বস্তরের মানুষ—যার মধ্যে তাঁর মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণকারী ইংরেজ এবং পার্শ্ববর্তী দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারাও ছিলেন—তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন। বলা হয়ে থাকে যে, সে সময় সিঙ্গাপুরের সমস্ত ঘোড়ার গাড়ি তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে বয়স্ক, নারী ও শিশুদের বিনামূল্যে জানাজায় বা শেষকৃত্যানুষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হয়েছিল। জাতি ও ধর্মের ভেদাভেদ সত্ত্বেও সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে তিনি কতটা প্রভাবশালী ও প্রিয় ছিলেন, এটি ছিল তারই এক অনন্য নিদর্শন।
ধারাবাহিক রওজা শরীফের উন্নয়ন কার্যক্রম
১৯৮০-এর দশকে মাজার ও সংলগ্ন মসজিদ পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং ১৯৮৭ সালে তা পুনরায় খুলে দেওয়া হয় নতুন রূপে ।
২০১৭ সালে আরও উন্নয়ন করা হয়। পাহাড়চূড়ার রওজায় বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সহজ প্রবেশের জন্য লিফট স্থাপন করা হয়।
২০২২ সালে আবার শুরু হয় ব্যাপক সংস্কার। দীর্ঘ কাজ শেষে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রওজা শরীফ সর্বশেষ খুলে দেওয়া হয় বর্তমান রূপে । নতুন গম্বুজ, ঝাড়বাতি, সমাধিফলক ও গ্রন্থাগার—সবকিছু মিলে ঐতিহাসিক এই স্থানটি নতুন সৌন্দর্যে ফিরে আসে।
কিন্তু সৌন্দর্য যতই নতুন হোক, এর প্রাণ সেই পুরোনো স্মৃতিতেই—একজন আল্লাহওয়ালা বান্দার স্মৃতিতে।
*মহান ওলী হাবিব নোহ হাবসি রহঃ কারামতঃ
পবিত্র কোরআন শরীফে সূরা বাকারায় ১৫৪ নং আয়াতে মহান আল্লাহ পাক বলেন, “যাহারা আল্লাহর রাস্তায় নিহিত বা মৃত হইয়াছেন, তাহাদের কে তোমরা মৃত বলো না, বরং তাহারা জীবিত তোমরা অনুভব করতে পারো না”
আরো অনেক আয়াত পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ওলী আওলিয়াদের শানে নাজিল করেছেন। তারপরও ওলী আওলিয়াদের শান শওকত বাড়ানোর জন্য মহান আল্লাহ পাক কিছু কারামত প্রকাশ করেন দুনিয়ায়। আল্লামা হাবিব নোহ হাবসি রহঃ এর মাধ্যমেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন অসংখ্য কারামত প্রকাশিত করেছেন । নিম্নে কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করলাম
* মহান ওলী হাবিব নোহ হাবসি রহঃ ওসিয়ত করেছিলেন ওফাত এর পর পাহাড়ের চূড়ায় সমাহিত করার জন্য। কিন্তু তৎকালীন সমাজ ওনার এই ওসিয়ত পালনে বাধাঁগ্রস্থ করেন, তারা সিদ্ধান্ত নেন স্থানীয় কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে। আল্লাহর ওলীদের শান শওকত তো আর সবাই বুঝতে পারেন না, যারা আল্লাহর প্রেমিক বন্ধু হয়ে যান, মহান আল্লাহ নিজেই তাদের হয়ে যান। সুবহানাল্লাহ্! যখন কবরস্থানে নিতে সিদ্ধান্ত করেন, সকলে মিলে শতো চেষ্টা করেও চুল পরিমাণ খাটিয়া নাড়তে পারেন নি। আল্লাহ তালাহ্ অসম্ভব ভারী করে দিলেন মহান ওলীর খাটিয়া মোবারক। সুবহানাল্লাহ্।
শতো চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে সবশেষে সাধকের ওসিয়ত অনুযায়ী পাহাড়ের চূড়াতেই সমাহিত করা হয়। যেখানে বর্তমান দরগাহ শরীফ অবস্থিত।
* দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমান থেকে মাজার শরীফের ওপর বোমা নিক্ষেপ করা হলেও কোনো ক্ষতি হয়নি—এমন একটি জনশ্রুতি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
* আরেক কাহিনিতে বলা হয়, মাজার নির্মাণে বাধা দেওয়া এক পারস্যের তত্ত্বাবধায়ক নানা অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। পরে নির্মাণকাজের অনুমতি দেওয়ার পর তাঁর সেই অসুস্থতা দূর হয়ে যায় বলে কথিত আছে।
* নিবন্ধের শুরুতে ইসিপি (ECP) মহাসড়কের বাঁকের যে আকাশ থেকে তোলা ছবিটির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল, তা কি মনে আছে? হাবিব নোহকে মাউন্ট পামারে সমাহিত করা হয়েছিল; জীবদ্দশায় তিনি নির্জনে গভীর চিন্তামগ্ন হওয়ার জন্য এই স্থানটিতেই যেতেন। আশির দশকে ইস্ট কোস্ট পার্কওয়ে (ECP) এক্সপ্রেসওয়েটি ওই এলাকার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। জনশ্রুতি আছে যে, বুলডোজার দিয়ে মাজারটি (মাকাম) গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সেগুলো আর কাজ করছিল না। এরপর পরিকল্পনা পরিবর্তন করা হয় এবং মাজারটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। তবে এক্সপ্রেসওয়ের ভিত্তি স্থাপন করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিল। জানা যায় যে, নির্মাণকাজ সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নেওয়ার আগে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মাজারের ট্রাস্টিদের কাছে বিশেষ প্রার্থনার অনুরোধ জানিয়েছিল এবং মাজারের পানি ভিত্তিস্থলে ঢালার ব্যবস্থা করেছিল।
Maqam Habib Noh
80 Shenton Wy, Singapore 079122
যাতায়াতঃ বাস, ট্রেন ও টেক্সি তে যাওয়া যায় মাজার শরীফে
তবে সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবহন mrt সার্কেল লাইনের ৩২ নং স্টেশনে নেমে ২ নং এক্সিট দিয়ে উপরে উঠলেই দেখতে পাবেন পবিত্র রওজা শরীফ
Prince Edward Road(CC32)
Exit-2
তথ্য অনলাইন থেকে সংগ্রহিতঃ
সংগ্রহেঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী
Leave a Reply