
সিঙ্গাপুর ইস্কান্দার শাহ রহঃ এর মাজার শরীফ
মহররম হোসেন, আমাদের চ্যানেলঃ সিঙ্গাপুরের ইতিহাস, মালয় ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিক স্মৃতিচিহ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কেরামত ইস্কান্দার শাহ, যা কেরামত সুলতান ইস্কান্দার শাহ নামেও পরিচিত। এটি সিঙ্গাপুরের সেন্ট্রাল এরিয়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ফোর্ট ক্যানিং হিল-এ অবস্থিত একটি প্রাচীন স্মৃতিসৌধধর্মী সমাধি-স্মারক ও সাবেক ধর্মীয় মাজার। বহুদিন ধরে এটি মালয় ইতিহাসের কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব সুলতান ইস্কান্দার শাহ রহঃ-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রচলিত আছে। মালয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি মালাক্কার পারমেশ্বরা নামে পরিচিত ঐতিহাসিক শাসকের সঙ্গে যুক্ত, যিনি ইসলাম গ্রহণের পর ইস্কান্দার শাহ নাম ধারণ করেছিলেন বলে বলা হয়।
তবে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই মাজারের প্রকৃত পরিচয় ও সমাধিস্থল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এটি সুলতান ইস্কান্দার শাহের প্রকৃত কবর নয়, বরং তাঁর স্মরণে নির্মিত একটি পবিত্র স্মারক বা কেরামত। আবার কিছু মত অনুযায়ী, এটি হয়তো মালয় ঐতিহ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব সাং নিলা উতামার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এ কারণে কেরামত ইস্কান্দার শাহ শুধু একটি মাজার নয়, বরং সিঙ্গাপুরের প্রাচীন মালয় ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
১৮২২ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ ফোর্ট ক্যানিং হিলের উপরিভাগে “মালয় রাজাদের” সমাধির অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করে। তবে তখন তারা সমাধিগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিচয় দেয়নি এবং সেগুলোকে ধর্মীয় স্থান হিসেবেও চিহ্নিত করেনি। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে জন ক্রফার্ড সিঙ্গাপুরে অবস্থানকালে এই স্থানের সম্পর্কে প্রথম বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন। তিনি এটিকে সুলতান ইস্কান্দার শাহের সমাধি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বর্ণনা করেন যে এটি একটি সাধারণ কাঠামো হলেও স্থানীয় মানুষের কাছে তা সম্মানিত ছিল। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, শুধু মুসলিমরাই নয়, তৎকালীন এলাকার হিন্দুরাও এই স্থানে যাতায়াত করত। এতে বোঝা যায়, এই স্থানটি বহু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এক ধরনের পবিত্র ও শ্রদ্ধেয় স্মৃতিস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৮৫৮ থেকে ১৮৬১ সালের মধ্যে এই মাজারটিকে একজন অজ্ঞাতনামা ফকিরের সমাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তী সময়েও এটি স্থানীয় বিশ্বাস, কিংবদন্তি ও আধ্যাত্মিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সিঙ্গাপুরে জাপানি দখলদারিত্বের সময় মাজারটি অক্ষত রাখা হয়েছিল। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ওই এলাকায় থাকা জাপানি সৈন্যরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল এবং বিশ্বাস করত যে এই স্থানে অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে। সে কারণে তারা মাজারটির কোনো ক্ষতি করেনি।
১৯৭১ সালের দিকে মাজারটি জিঙ্কের ছাদযুক্ত একটি পাথরের ঘর হিসেবে বর্ণিত হয়। এর সঙ্গে একটি ছোট কুঁড়েঘর সংযুক্ত ছিল, যা মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ এক সময় এই স্থানটি শুধু স্মৃতিসৌধ নয়, বরং ইবাদত ও ধর্মীয় কার্যক্রমের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তবে ১৯৭৫ সালের মধ্যে মসজিদসহ মাজারের অধিকাংশ স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হয়। পরে ১৯৭০ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে কবরের ওপর একটি স্মৃতিসৌধধর্মী সমাধি-স্মারক নির্মাণ করা হয়, যা আজও বিদ্যমান।
১৯৯০-এর দশকে কেরামত ইস্কান্দার শাহকে নতুনভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং এটিকে একটি প্যাভিলিয়নসদৃশ রূপ দেওয়া হয়। বর্তমান কাঠামোটিই সেই পুনর্নির্মিত রূপ। তবে পরবর্তীকালে স্থাপনাটি ধর্মীয় মাজার হিসেবে তার পূর্বের মর্যাদা হারায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এটি একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে পরিচিতি পায়। বর্তমানে এই স্থানে কোনো ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করার অনুমতি নেই।
সুলতান ইস্কান্দার শাহ রহঃ-এর পরিচয় নিয়েও ইতিহাসে মতভেদ রয়েছে। মালয় ঐতিহ্য অনুযায়ী বলা হয়, পারমেশ্বরা ইসলাম গ্রহণের পর ইস্কান্দার শাহ নাম ধারণ করেন। আবার কিছু ঐতিহাসিক মত অনুযায়ী, ইস্কান্দার শাহ ছিলেন পারমেশ্বরার পুত্র মেগাত ইস্কান্দার শাহ। চীনা দরবারের নথিপত্রে পিতা ও পুত্রের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। তবে অন্য অনেক গবেষক মনে করেন, চীনা দরবারের মতো একটি সুসংগঠিত প্রশাসনের পক্ষে পারমেশ্বরা ও তাঁর পুত্রকে আলাদা করে চিনতে না পারা খুব সহজ বিষয় নয়, বিশেষ করে পুত্রটি চীনা দরবারে বেশি ঘন ঘন যাতায়াত করতেন বলে উল্লেখ আছে।
এই মাজারের সঙ্গে আরও কিছু দাবি যুক্ত হয়েছে। বিলুপ্ত তাকওয়া সংগঠন একসময় দাবি করেছিল যে এটি নবম শতাব্দীর আব্বাসীয় যুগের ইরাকি মুসলিম আলেম আবু তালিব আল-মাক্কির সমাধি। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ইতিহাসে আবু তালিব আল-মাক্কির মৃত্যু ৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদে হয়েছে বলে জানা যায়, সিঙ্গাপুরে নয়। তাই এই দাবি ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
১৯৮০-এর দশকে কেরামত ইস্কান্দার শাহের আশপাশে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ পরিচালিত হয়। সেখানে পুরোনো চীনামাটির ভাঙা টুকরা এবং তাং রাজবংশের মুদ্রাসহ নানা নিদর্শন পাওয়া যায়। এসব নিদর্শন চীনে তৈরি বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো প্রমাণ করে যে ফোর্ট ক্যানিং হিল অঞ্চলটি বহু আগে থেকেই বাণিজ্য, বসতি ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
স্থাপত্যের দিক থেকে বর্তমান কেরামত ইস্কান্দার শাহ একটি কাঠের প্যাভিলিয়ন, যার ছাদ টাইলস দিয়ে তৈরি। এর বর্গাকার ভিত্তির আকার প্রায় ১২ মিটার × ১২ মিটার। কাঠামোর মাঝখানে একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর পাথরের সমাধি-স্মারকটি স্থাপন করা হয়েছে। অতীতে মাজারটি আরও বড় পাথরের স্থাপনা ছিল, যার জিঙ্কের ছাদ এবং একটি প্রার্থনাকক্ষ ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের মধ্যে সেই পুরোনো স্থাপনাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে, সিঙ্গাপুরের কেরামত ইস্কান্দার শাহ রহঃ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিচিহ্ন। যদিও এখানে প্রকৃত কোনো সমাধি আছে কি না, কিংবা এটি সুলতান ইস্কান্দার শাহ রহঃ-এর আসল কবর কি না—তা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে, তবুও স্থানটি মালয় ঐতিহ্য, ইসলামি স্মৃতি, স্থানীয় লোকবিশ্বাস এবং সিঙ্গাপুরের প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই কেরামত ইস্কান্দার শাহ আজও সিঙ্গাপুরের অতীত ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে
Leave a Reply