
আল্লামা ইকবালের খুদীতত্ত্ব ও বিশ্ব মুসলিম জাগরণ
– মোস্তাক আহমাদ
‘খুদী’র জাগরণের আহ্বান ছিল ইকবাল কাব্যের অনন্য বৈশিষ্ট্য। বিপর্যস্ত মানবতার সংকট মুক্তির প্রয়াসে তাঁর কাব্য দর্শনে রয়েছে উন্নততর জীবন বোধের সন্ধান। তিনি মুসলিম জাতির কাছে তাঁর হৃদয়ের আকুতি নিবেদন করেছেন জ্ঞান প্রজ্ঞা ও উপলব্ধির সীমাহীন চৈতন্যের সাথে। ঘোষণা করেছেন নবচেতনা ও প্রেরণাদায়ী মহান বারতা :
‘খুদী’র জোরেই মুসলমানের
ঘটতে পারে পূর্ণ বিকাশ ॥
‘খুদী’ই যদি যায় হারিয়ে
তাহলে সে অন্যেরই দাস ॥
আজকের বিশ্ব ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য আমরা ইকবালের কাছে চিরঋণী। বিশ্ব মুসলিম সংহতি, পুনর্জাগরণের এবং নব উদ্যম ও প্রেরণা সৃষ্টিতে তাঁর কবিতার ভূমিকা অপরিসীম। আসন্ন নবজাগরণ ও তাওহীদের উত্থান তিনি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিকে অবলোকন করে ঘোষণা করেছেন :
উষার আলোয় রাঙলো আকাশ
তিমির কুহেলী রজনী যায়,
এবার চমনে তাওহীদি গান
ঝংকৃত হবে ভোরের বায় ॥
ঘোর অমানিশার অন্ধকার বিদূরিত করে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত মুসলিম মিল্লাতের নবচেতনার অগ্রসৈনিক আল্লামা ইকবাল। তাঁর মতো যুগে যুগে অনেক প্রথিতযশা মনীষী ও বিপ্লবী সংস্কারকের আবির্ভাবে মুসলিম জাতি সমৃদ্ধ ও উন্নত জীবনবোধের সন্ধান পেয়েছে। বিশ্বনবীর আদর্শ ও কুরআনের শিক্ষার উদ্দেশ্য তাঁরা সহজ সরলভাবে ব্যক্ত করে পতিত ও আশাহত মুসলমানদের আশার বাণী শুনিয়ে উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার প্রেরণা দিয়েছেন। তাঁরা অধঃপতিত জাতিকে সত্য-ন্যায়ের পথে আহ্বান করেছেন। কিন্তু বাধ সেধেছিল কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠি। তারা এসব মনীষীর উপর চালিয়েছিল অত্যাচারের স্টীম-রোলার- অকথ্য নির্যাতন ও অপবাদের প্রচারণা। তবুও তাঁদের মিশন সফলতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছিল। আল্লামা ইকবালও তাঁর সাহিত্য-সাধনার মাধ্যমে মুসলিম মিল্লাতের নবজাগরণের আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন :
বুলবুলির কুহুতানে হয়তো
হৃদয় আবার দীর্ণ হবে,
নিদ্রাতুর অলস পথিক
জাগবে আবার ঘন্টারবে ॥
ওফাদারীর অনুরাগে
প্রাণটি আবার উঠবে জেগে,
পূর্ব-সুরা পান করতে
মনটি আবার ব্যস্ত হবে ॥
আজম দেশী পাত্র হলেও
সুরা আমার আরব দেশী,
গান যদিও হিন্দী আমার
সুরটি সেই হেজায দেশী ॥
আজকের বিশ্বের প্রায় সোয়া দেড় শ’ কোটি মুসলমান তাওহীদের জীবনবাদে উদ্দীপ্ত। আল্লামা ইকবাল এই জাগরণের ধারাকে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি উম্মতে মুহাম্মদীর চরম বিপর্যয়কালের জন্য আলোর পথের দিশা দিয়ে গেছেন। বস্ততপক্ষে তাঁর এই অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তিনি যুগ-যুগ ধরে তাওহীদি জনতার হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। জাতিও তাঁর কাছে চিরঋণী থাকবে।
আল্লামা ইকবাল (র.) উপমহাদেশের এক কৃতিসন্তান। ইকবালের আবির্ভাব মুসলিম জাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তাঁর আগমন মুসলিম জাতিকে সমৃদ্ধ ও সম্মানিত করেছে। বিভাগ-পূর্ব ভারতে তাঁর আবির্ভাব ও তিরোধান। বিশ শতকের ইসলামী নবজাগরণের তিনি সিপাহ্সালার এবং কাব্য ও দর্শনের জগতে ছিলেন পূর্বসূরীদের চিন্তাধারার সার্থক রূপকার। বিশ্বনবীর অনুসরণীয় আদর্শ ও ইসলামের শাশ্বত সার্বজনীন জীবন বিধান জাতির কাছে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনি যে সুনিপুণ ও দক্ষ শিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন, তা ছিলো যুগের দাবী ও অতীতের প্রেরণা সঞ্জাত। তিনি নিজেই বলেছেন :
সামনে রাখতা হোঁ উস্ দওরে নশাত আফযা কো মাঁয়
দেখতো হোঁ দওশ কি আয়নে মেঁ ফরদা কো মাঁয় ॥
অর্থাৎ বিশ্বজোড়া খ্যাতি ভরা অতীত আমার সামনে রাখি
গতকালের আসিতে মোর নতুন দিনের স্বপ্ন দেখি ॥
উপরোক্ত কাব্যে আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের অতীত ঐতিহ্য, খ্যাতি মসৃদ্ধির আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ভবিষ্যতের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এই উপমহাদেশেই যেসমস্ত সুফিয়ায়ে কিরাম ও পীর-ফকির-দরবেশ-বুজুর্গদের আগমন ও তাঁদের আদর্শিক ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তিনি তাঁদের কথা বলেছেন। তাই ইকবালের জীবন ও কর্ম আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে উপমহাদেশের ইসলাম প্রচার ও প্রসারের প্রেক্ষাপট এবং মুসলিম উম্মাহ্র পথ পরিক্রমার উপর আলোকপাত করা অপরিহার্য বলে মনে করছি। আল্লামা ইকবালের খুদীতত্ত্ব ও পরমজ্ঞানের রহস্যের মাধে যে আদর্শ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সার্বজনীন শিক্ষার সমন্বয় ঘটেছে তা বিশ্বজনীন আদর্শ, শান্তি, কল্যাণ, ভ্রাতৃত্ব ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্তের প্রতীক বিশ্বনবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও কুরআনের সুমহান শিক্ষা। অন্যভাবে বলা যায় কুরআনই হলো বিশ্বনবীর জীবন চরিত। কেননা উম্মাহাতুল মুমিনীন হযরত আয়শা ছিদ্দিকা (রা.) কর্তৃক এক হাদিস মারফত জানা যায় যে বিশ্বনবীর জীবন চরিতই হলো আল-কুরআন।
বিশ্বনবীর আদর্শ ও কুরআনের শিক্ষার বিস্তার যাদের জীবনে সবচাইতে বেশি ঘটেছিল তাঁরা হলেন সাহাবা আজমাঈন, তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন এবং সমসাময়িক বা পরবর্তীকালের সুফিয়ায়ে কিরামগণ। মূলত তাদের আবির্ভাবের কারণেই ভারতবর্ষে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে মুসলিম সাম্রাজ্যের বিজয় সূচিত হয়েছে। সুফি-দরবেশ, পীর-ফকির-বুজুর্গদের দ্বারাই এ অঞ্চলে ইসলাম বিস্তার ও প্রসার লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।
🔳মোস্তাক আহমাদ
সুফি লেখক ও গবেষক।
Leave a Reply