বিদ্বেষ ! হিংসা-প্রতি হিংসায় মানুষ নিজেকে তথা সমাজকে ধ্বংস করে - আল্লামা হানিফ নূরী পীর সাহেব
বিদ্বেষ বা হিংসা মানুষের মনের একটি নেতিবাচক আবেগ, যা কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের শান্তি ও অগ্রগতির জন্য ক্ষতিকর।
এটি একটি মানসিক ও আত্মিক ব্যাধি, যা ঈর্ষা, লোভ, বা অহংকার থেকে জন্ম নেয়।
বিদ্বেষের গঠনমূলক আলোচনা ও এর প্রভাব নিচে তুলে ধরা হলো:
১. বিদ্বেষের উৎস ও ধরণ
মানসিক ব্যাধি:
বিদ্বেষ হলো মানুষের হীন মনমানসিকতা ও অহংবোধের বহিঃপ্রকাশ।
প্রকারভেদ:
এটি সাধারণত দুই ধরণের—প্রকাশ্য শত্রুতা এবং সুপ্ত বা মনের গভীরে পুষে রাখা হিংসা।
কেন তৈরি হয়:
কারো সম্পদ, পদমর্যাদা বা সাফল্য দেখে নিজের মধ্যে যে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়, তা থেকেই বিদ্বেষের জন্ম।
২. সমাজের ওপর বিদ্বেষের প্রভাব
সম্পর্কের অবনতি:
বিদ্বেষ পরিবার ও সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং পারস্পরিক আস্থাহীনতা বাড়ায়।
নেতিবাচক কর্মকাণ্ড:
হিংসুকের প্রধান লক্ষণ হলো—পিছনে নিন্দা করা, সামনে তোষামোদ করা এবং অন্যের বিপদে আনন্দিত হওয়া।
উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত:
বিদ্বেষ ও হানাহানি যুবসমাজকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে এবং মাদকের মতো নেশায় জড়িয়ে ফেলে।
৩. ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
গুণাবলি ধ্বংস:
বিদ্বেষ মানুষের সৎ কর্ম ও পুণ্যকে ঠিক সেভাবেই পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, যেমন আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে দেয়।
ঈমানের পরিপন্থী:
অন্যের জন্য যা নিজের জন্য পছন্দ করা হয়, তা পছন্দ না করা পর্যন্ত সত্যিকারের মুমিন হওয়া যায় না। বিদ্বেষ ঈমানকে দুর্বল করে দেয়।
৪. উত্তরণের উপায়
আত্মসংশোধন:
নিজের মনকে হিংসা ও বিদ্বেষমুক্ত রাখতে হবে।
পজিটিভ মানসিকতা:
অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত না হয়ে নিজের কর্মক্ষেত্রে মনোযোগী হতে হবে।
ঐক্যবদ্ধ হওয়া:
হানাহানি ভুলে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করতে হবে।
রাগ, বিরক্তি এইগুলো হচ্ছে বিষ এবং বিষের ঘোড়া। এই বিষের ঘোড়া সর্বদা অন্তরের ভিতর দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে এবং উত্তেজিত করে অশান্তির আগুনের ভিতর ডুবিয়ে রাখছে।
মানুষ সেই বিষ খাচ্ছে আর আশা করছে অন্য কেউ মরুক এবং ধরাশায়ী হোক। ইহা সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। অন্তরের রোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে আর নিজেই নিজেকে বিনাশ করছে।
মানুষ দূর্বল জায়গায় আঘাত পেলে অস্থির হয়ে উঠে, রাগ অন্তরের উপর প্রভাব বিস্তার করে আর সাথে বিবেক, বুদ্ধি হারিয়ে বসে।
এই অবস্থায় রাগের কারনে জিভ ও অন্তর কম্পিত হতে থাকে প্রতিপক্ষকে জবাব দেওয়ার, আঘাত বা কথার মাধ্যমে ঘায়েল করার।
এই জগত সংসারকে স্বাভাবিকতার সহিত গ্রহণ না করলে এই বিষ থেকে নিস্তার নেই। নিশ্চয়ই সংসারে ধৈর্য ধারণ অত্যন্ত সাহস ও দৃঢ়তার কাজ।
ইসলামের পরিভাষায় এই সাহস ও দৃঢ়তা হচ্ছে “জিহাদ”(জিহাদের স্তর রয়েছে) আর শান্তিপ্রিয় মানুষ ব্যতীত অন্য কারো পক্ষে জিহাদে উত্তীর্ণ সম্ভব না।
তাকওয়া ও প্রকৃত বিনয় অন্তরধারীরা ব্যতীত দুনিয়ার প্রায় সকল মানুষজনেরা “বিরক্তি” নামক বিষের ঘোড়ার কাছে পরাভূত।
রাগ, লোভ, হিংসা, অহংকার, ভয়, দয়া, ভালবাসা ইত্যাদি সকল প্যারামিটার অন্তরে কম্পনের সৃষ্টি করে এবং এই কম্পনের দ্বারা প্রত্যেকের কর্ম আচ্ছাদিত হয়।
জিহবার যেমন স্বাদের ভিন্নতা রয়েছে তেমনি কম্পনের দ্বারা সৃষ্ট অন্তরের স্বাদের ভিন্নতা। রাগের কম্পন সবচেয়ে ক্ষিপ্র, তেজি কিন্তু স্থায়িত্ব কম।
চিন্তার জগতে রাগের স্থায়িত্ব লম্বা হলে টেনে আনে বিদ্বেষকে এবং বিদ্বেষ টেনে আনে প্রতিশোধ পরায়ণতাকে।
কামনা ও হিংসার সাথে বিদ্বেষের সংমিশ্রণে “প্রতিশোধ পরায়ণতা” কত ভয়ংকর হয়ে উঠে।
মূলবার্তা:
বিদ্বেষ একটি সংক্রামক ব্যাধি যা নিজেকেই বেশি পুড়িয়ে মারে। তাই, সুস্থ ও শান্তিময় সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বিদ্বেষ পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা চর্চা করা জরুরি।
ভালো মানুষদের সাথে সঙ্গ দেয়া এবং হিংসা-বিদ্বেষের পরিবর্তে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের চর্চা করাই এহেন জঘন্য কাজ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।
আধ্যাত্মিক গবেষক ও লেখক শাহসুফি আল্লামা হানিফ নূরী পীরসাহেব,
নূরে হক দরবার শরীফ,
মহাসচিবঃ আশিক্কীনে আউলিয়া ঐক্য পরিষদ বাংলাদেশ।
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানঃ হযরত লাডুমশাহ (রঃ) আধ্যাত্মিক গবেষনা কেন্দ্র।
সন্মানীত উপদেষ্টাঃ জাতীয় দৈনিক “ঐশি বাংলা” পত্রিকা।
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষঃ সানফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী