আলেমদের পরিচয় এবং বর্তমান আলেমদের অবস্থা ! প্রকৃত আলেম কারা - আল্লামা হানিফ নূরী পীর সাহেব
আলেম মানে জ্ঞানী, কেমন জ্ঞানী ?
আলেম (عالم) শব্দের শাব্দিক অর্থ জ্ঞানী, পন্ডিত বা বিদ্যান। তবে ইসলামী পরিভাষায় আলেম বলতে সাধারণ জ্ঞানী নয়, বরং এমন ব্যক্তিকে বোঝায় যিনি পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, ফিকহ (ইসলামী আইন) ও শরীয়াহ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন এবং হালাল-হারাম, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে পারেন।
আলেমগণ সন্মানিত এবং আল্লাহ্ তাদের মর্যাদা উচ্চ করেছেন। কোরআন-হাদিস উত্তম রূপে বুঝার উদ্দেশ্যে আলেমের বিকল্প নেই।
আল্লাহ কোরআনের হিকমাহ(প্রজ্ঞা) নবী(সা)-কে শিখিয়েছেন। নবী(সা) সেই হিকমাহ সাহাবী, পরবর্তীতে তাবেঈন, তাবে-তাবেঈণ এবং পরে আলেমদের মধ্যে প্রবাহিত।
আলেমগন মুসলিম উম্মাহকে কোরআনের আলোকে পথ দেখান, নবী(সা)-র শিক্ষায় দীক্ষিত করেন। মুসলিম জাতির কর্ণধার আলেম সমাজ।
কিন্তু এখন প্রকৃত আলেম কারা ?
“প্রকৃত আলেম” পাওয়া বড় দুষ্কর। হিংসা-প্রতিহিংসা, আধিপাত্য, অর্থের প্রাধান্য, জ্ঞানের অহংকারের দরুণ প্রকৃত আলেমের সংখ্যা পরিমানে অল্প।
আকিদা, মাজহাব, কোরআনের মর্মার্থ, হাদিসের ব্যাখ্যা, ফিকহ, মাসায়েল সবকিছু নিয়ে জ্ঞানের কাঁদা ছুড়াছুড়ির মাধ্যমে বিশ্বের মানুষদের ক্লেশের সাথে নিজেরাও হাসির পাত্র হচ্ছে।
প্রকৃত আলেম কারা? প্রসঙ্গিক প্রশ্ন। আশপাশের জ্ঞানী দশজন মুসলিমদের কাগজ-কলম দিয়ে “আলেম”-র সংজ্ঞা লিখতে বললে, দশজন দশ রকমের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করবে।
সাধারণ অর্থে আলেম বলতে বুঝায় যার কোরআন ও হাদিস সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রয়েছে, সেই সাথে আল্লাহর ভয়ে সর্বদা ভীত, আচরণে মাধুর্যতা।
বৃক্ষ যেমন ফলের ভারে নিচের দিকে ঝুলে থাকে তেমনি জ্ঞানের ভারে আলেমগণ বিনয়ী হয়ে ঝুলে থাকে; ধৈর্যশীলতা ও লজ্জ্বাশীলতার পরিপূর্ণতা।
আলেমদের চারটি বৈশিষ্ট্য-
এক. তারা কোরআনের কালাম তিলাওয়াত করে মানুষদের শুনায়।
দুই. আল্লাহ্র কালামের অর্থ, বিধিবিধান, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে শিখায়।
তিন. হিকমাহ অর্থাৎ সুন্নত পদ্ধতি শিখায়। চার. মুসলিমদের আত্মশুদ্ধি করেন।
অনেক সংখ্যক আলেম ও মুসলিম ইসলামের খেদমতে, মানবতার কল্যাণে আত্মনিবেদন করেছেন, নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাদের কর্মফল ও পুরষ্কার আল্লাহ্র কাছে।
সমাজে অনেক কপট, ভানকারী আলেম ও মুসলিম রয়েছে আবার অনেকে মুসলিম সেজে রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফায়দা নিচ্ছে। আলোচনায় শুধু সেই সকল ধূর্তদের নিয়ে।
বর্তমান আলেমদের বড় একটি দল নিজেদের চারিত্রিক দলিলের সাথে ভক্তিমাখা পরিচয়ের সহিত নিজেদের জাহির করার চেষ্টায় ব্যপৃত। আর সাধারণেরা তাদের ভুলের উর্ধ্বে মনে করে তাদের পা ছুতে বা হাতে মুসাহাফা করে নিজেকে ধন্য মনে করে।
কিন্তু ওনারা সবাই আল্লাহতায়ালার বিচারে উত্তীর্ণ হবেন না আর সেজন্যই সন্মানদাতা হিসেবে, অনুগত-অনুরক্ত হিসেবে আলেমদের ব্যাপারে বড় রকমের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন যাতে করে হাশর তাদের সাথে না হয় যাঁদের টেনে হিচড়ে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।
আলেমগণের বড় একটি সংখ্যা শাসকগোষ্ঠীর মোসাহেবে ব্যস্ত। মোসাহেবের মনমানসিকতার অধিকারী হলে হিকমাহ কখনই সম্ভব না। “আমর বিন মা’রুফ এবং নাহি আনিল মুনকার” করতে আলেমদের ভূমিকা মৌলিকভাবে প্রত্যাশিত। কিন্তু নিজেদের রিপুর তাড়নায় সততা তো নেই বরং মসজিদ কমিটির রাজনীতির ফাঁদে সানন্দে নিজেদের নৈতিকতা বিক্রি করে।
এমন আলেমদের থেকে দূরে থাকাই উত্তম।
ঈমাম আবু হানিফা, ঈমাম শাফেঈ, ঈমাম মালেক বিন হাম্বলদের শাসকগোষ্ঠী কখনই নিজেদের দলে ভেড়াতে পারেনি। হত্যা ও জঘন্য ভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে এই ঈমামদের।
আলেমদের আরেক শ্রেনী বিশেষ মাজহাব, ফিকহ অনুসরণ করেন এবং বাকীদের “বাতিল” বলে গণ্য করে আর একে অপরের বিরুদ্ধে অনুসারীদের অন্তর-মগজ বিষিয়ে তুলে।
নবী(সা)-র একে অপরের সাথে ভালবাসা, ভাতৃত্ব বন্ধন শিখিয়েছেন আর আলেমরা বিষবাষ্প ছড়াতে ব্যস্ত।
নিজেদের মনগড়া তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে নিজেদের “সহিহ” আকিদার দাবীর ঘোষনা করে। বিদআতের ব্যাপারে শুধু অসতর্কতাই নয়, ইহাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্বীনের কেন্দ্রে নিয়ে এসে নতুন আকিদা’র জন্ম দেয়। ওয়াজ মাহফিলে অহংকার ও হিংসার দরুন আলেমদের একদল আরেকদলের উদ্দেশ্যে মন্দ বাক্য, অশালীন ভাষা প্রয়োগে অগ্রগামী।
দ্বীনকে নিজেদের বিত্তশালী হওয়ার মাধ্যম বানানো এবং দুনিয়াতে বিলাসিতার জীবন যাপন করে। কবীরা-সগীরার পার্থক্য বিবেচনায় না নিয়ে বরং ছোটখাট বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে।
“মুসলিম” পরিচয় না দিয়ে নিজে ও অনুসারীদের বিশেষ দল, উপদলে পরিচয় ও চিহ্নিত করে।
তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, চিন্তা-চেতনা পর্যবেক্ষন করলে পরিষ্কার হয়, তারা এক প্রকার বোতলবন্দী এবং আধুনিক সভ্যতার সহিত অসামঞ্জস্য। নিজেদের ঘরাণার শিক্ষকদের কাছ থেকে শেখে, তাদের বই-পুস্তক পড়ে এবং তাদেরই ওয়াজ-বয়ান শুনে এবং অন্য ঘরাণার শিক্ষক ও বই-পুস্তক গবেষণা থেকে অনুসারীদের দূরে সরিয়ে রাখে।
ব্যক্তি স্বাধীনতায় ও ধর্ম বিশ্বাসের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়। এই জীবন ক্ষনস্থায়ী ও মূল্যহীন এই ধরণের চেতনা ধারণ করে মাদ্রাসা কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
আলেমদের কথা ও কাজের মিল নেই। তাদের বক্তব্য ও ফতোয়ার প্রভাব কি সে সম্পর্কে বিচক্ষণতা কম এবং উদাসীন। বিবেক-বুদ্ধি জাগরণে ও বিকাশে এবং ইসলামভিত্তিক স্বাধীন চিন্তাভাবনার উপর গুরুত্ব আরোপ ও সচেতন না করে, নিজেদের চিন্তা-চেতনার চশমা অনুসারীদের চোখে পড়িয়ে দেয়।
নিজেদের মনগড়া মতবাদ, আইনবাদী প্রবণতা ইসলামের নীতি ও মূল্যবোধের উপর অগ্রাধিকার দেয়।
নিজেদের বিচারকের আসনে বসিয়ে সহজেই অন্যদের মূল্যায়ন/বিচার করে। কথা বলার সময় চিৎকার, চেঁচামিচি আবার কেহ গানের সুরে ওয়াজ/কথা বলে। মানবতার বন্ধনকে যথাযথ ও পর্যাপ্তভাবে বিবেচনায় নেয় না।
আলেমরা কথার জগতে বাস করে, সমাজ বান্ধব হয়ে মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে সম্পৃক্ত নয়, সামাজিক কল্যাণমুখী তৎপরতার সহিত সম্পৃক্ত হতে খুব একটা দেখা যায় না।
নিশ্চয়ই এই দুনিয়ার মূল্য রয়েছে, পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে এই দুনিয়া থেকেই।
“তাকওয়া” দুনিয়া থেকে বিলুপ্তির দিকে দ্রুততর।
ইসলামের অনুসারীরা আজ মূল্যহীন আমল ও ইবাদতে লিপ্ত। এই শ্রেনীর ইসলামের অনুসারীদের চিন্তা চেতনা ও কর্মের পচনের দূর্গন্ধে, বিশ্বে আজ ইসলামকে নিন্দিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
আধ্যাত্মিক গবেষক ও লেখক শাহসুফি আল্লামা হানিফ নূরী পীরসাহেব,
নূরে হক দরবার শরীফ,
মহাসচিবঃ আশিক্কীনে আউলিয়া ঐক্য পরিষদ বাংলাদেশ।
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানঃ হযরত লাডুমশাহ (রঃ) আধ্যাত্মিক গবেষনা কেন্দ্র।
সন্মানীত উপদেষ্টাঃ জাতীয় দৈনিক “ঐশি বাংলা” পত্রিকা।
প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষঃ সানফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজ,
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী