গানে, প্রেমে, জজবায় প্রেমময় বাবা নজরুল
পর্ব—১২ | প্রেম সাগরে ডুবছে আশেক
মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী
কুমিল্লা বুড়িচংয়ের “নজরুলীয়া দরবার শরীফ”-এর প্রতিষ্ঠাতা যুগশ্রেষ্ঠ সূফী সাধক, আধ্যাত্মিক লেখক ও গবেষক, ছানিয়ে রুমি, খলিফায়ে গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী, আল্লামা পীর নজরুল ইসলাম সাদকপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বাবাজান কেবলার রচিত কালামসমূহের মধ্যে “প্রেম সাগরে ডুবছে আশেক” একটি গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ কালাম। এই কালাম কেবল সুর, ছন্দ ও ভক্তির ভাষা নয়; বরং এটি সুফিবাদের প্রেমতত্ত্ব, নবীপ্রেম, মাওলার দিদার, আত্মসমর্পণ, ফনা, মারেফত এবং আশেক-মাশুক সম্পর্কের এক কাব্যিক ব্যাখ্যা।
কালামের মূল সুর হলো—আল্লাহর প্রেমে পৌঁছানোর পথ নবীপ্রেমের মধ্য দিয়ে উন্মুক্ত হয়। এখানে “প্রেম সাগর” কোনো সাধারণ আবেগের সাগর নয়; এটি আত্মার পরিশুদ্ধি, হৃদয়ের জাগরণ এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীক। আর “আশেক” হলেন সেই প্রেমিক বান্দা, যিনি দুনিয়ার মোহ, অহংকার, স্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রিকতা ত্যাগ করে দয়াল নবীর প্রেমের মালা গলায় ধারণ করেন।
কালামের প্রথম পঙ্ক্তি—
“প্রেম সাগরে ডুবছে আশেক
সেই প্রেমে মাশুক মিলে
দয়াল নবীর প্রেমের মালা
পড়ে নাও গলে।”
এই চারটি পঙ্ক্তিই পুরো কালামের মূল দার্শনিক ভিত্তি স্থাপন করে। সুফি সাহিত্যে প্রেমকে প্রায়ই সাগরের সঙ্গে তুলনা করা হয়, কারণ সাগরের যেমন গভীরতা আছে, তেমনি প্রেমেরও আছে সীমাহীন গভীরতা। যে প্রেম বাহ্যিক আবেগে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আত্মাকে বদলে দেয়, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং মানুষকে তার রবের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়—সেই প্রেমই এখানে “প্রেম সাগর”।
“মাশুক” শব্দটি সুফি ভাষায় প্রিয়তমের প্রতীক। আল্লাহই চূড়ান্ত মাশুক, আর বান্দা আশেক। তবে ইসলামী সুফি ব্যাখ্যায় এই মিলন কোনো শারীরিক বা অস্তিত্বগত মিশে যাওয়া নয়; বরং এটি নৈকট্য, আনুগত্য, সন্তুষ্টি ও মারেফতের রূপক। অর্থাৎ, আশেক যখন নবীপ্রেমের পথে নিজেকে সঁপে দেন, তখন তার হৃদয়ে আল্লাহর নূর, দয়া ও পরিচয়ের দরজা খুলে যায়।
কালামের দ্বিতীয় স্তবকে বলা হয়েছে—
“দয়াল নবীর প্রেমের মালা
যাহার গলে পরেছে
নূর নবীজির প্রেমের হালে
মাওলার দিদার পেয়েছে
আল্লাহ তালার নুরের জ্যোতি
জ্বলতেছে তাহার দিলে।”
এখানে “প্রেমের মালা” একটি শক্তিশালী প্রতীক। মালা সাধারণত সম্মান, গ্রহণযোগ্যতা ও আত্মসমর্পণের চিহ্ন। যে ব্যক্তি নবীপ্রেমের মালা গলায় ধারণ করে, সে নিজের জীবনকে নবীজির আদর্শের সঙ্গে বেঁধে ফেলে। তার চিন্তা, কাজ, আচরণ, দৃষ্টি ও হৃদয়ের গতিপথ বদলে যায়। সে আর কেবল নিজের ইচ্ছায় চলে না; বরং রাসুলপ্রেম তার জীবনকে পরিচালিত করে।
“নূর নবীজির প্রেমের হালে মাওলার দিদার পেয়েছে”—এই পঙ্ক্তি সুফি মারেফতের কেন্দ্রীয় ধারণাকে তুলে ধরে। নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়, বরং আল্লাহর পরিচয় লাভের একটি আধ্যাত্মিক মাধ্যম। যে হৃদয়ে নবীপ্রেম জাগ্রত হয়, সে হৃদয়ে অহংকার কমে, বিনয় বাড়ে, দয়া জন্ম নেয় এবং আল্লাহর নূরের উপলব্ধি তৈরি হয়। এখানে “দিদার” শব্দটি বাহ্যিক দেখা নয়; বরং আল্লাহর উপস্থিতি, দয়া ও নৈকট্যের অন্তরাত্মিক অনুভব।
কালামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি এসেছে কোরআনের আয়াতের ইঙ্গিত থেকে—
“কুলইন কুনতুম তুহিব্বুনাল্লা
ভালবাস আল্লাহকে
ফাত্তাবিউনী ইউহুবিব কুমুল্লাহ
রাজি কর নবীকে।”
এটি সূরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতের ভাবানুবাদভিত্তিক ব্যবহার। এই আয়াতে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের শর্ত হিসেবে রাসুলের অনুসরণকে কেন্দ্রীয় পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাই পীর নজরুল ইসলাম সাদকপুরী রহ.-এর এই কালামে প্রেম শুধু আবেগতাড়িত উচ্ছ্বাস নয়; এটি কোরআনিক নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত এক আধ্যাত্মিক পথরেখা।
“দয়াল নবী খুশী হইলে
মাওলাজির দিদার মিলে।”
এই পঙ্ক্তি সুফি আকিদা ও প্রেমতত্ত্বের গভীর বক্তব্য বহন করে। এখানে নবীজির সন্তুষ্টিকে আল্লাহর নৈকট্যের দরজা হিসেবে দেখা হয়েছে। কারণ নবীজি শুধু ইতিহাসের একজন মহামানব নন; তিনি রহমত, আদর্শ, শরিয়ত, সুন্নাহ ও আল্লাহর দিকে চলার পথের জীবন্ত মডেল। যে ব্যক্তি নবীজির চরিত্র, করুণা, সত্যবাদিতা, দয়া, আমানতদারি ও ইবাদতের পথ অনুসরণ করে, তার হৃদয় আল্লাহর প্রেমের জন্য প্রস্তুত হয়।
কালামের পরবর্তী অংশে নবীপ্রেমের কয়েকটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক উদাহরণ এসেছে—
“নবীর প্রেমে শহীদ হইয়া
পাইল প্রেমের পুরস্কার
গোসলে প্রেমিক হানজালা
পাইল আবে কাউছার।”
হানজালা রা.-এর ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে নবীপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক আলোচিত দৃষ্টান্ত। যুদ্ধের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি এমন অবস্থায় ময়দানে ছুটে যান, যখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্ত চলছিল। পরবর্তীতে তিনি শহীদ হন এবং ইসলামী বয়ানে তিনি “গাসিলুল মালাইকা”—অর্থাৎ ফেরেশতাদের দ্বারা গোসলপ্রাপ্ত—উপাধিতে পরিচিত হন। কালামে “আবে কাউছার” এখানে জান্নাতি পুরস্কার, পবিত্রতা ও নবীপ্রেমের সম্মানসূচক প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এরপর বলা হয়েছে—
“নবীর প্রেমে ওয়াস করুনী
বত্রিশ দন্ত দেয় ফেলে
নূর নবীজির জুব্বা পেলে
এস্কেরই বলে।”
ওয়াস করনী বা হজরত উওয়াইস আল-করনী রহ.-এর নাম ইসলামী আধ্যাত্মিক সাহিত্যে গভীর প্রেম, অদেখা ভালোবাসা এবং অন্তরের সম্পর্কের প্রতীক। তিনি নবীজিকে সরাসরি না দেখেও নবীপ্রেমে অনন্য মর্যাদা লাভ করেছিলেন—এ ধারণা মুসলিম ভক্তিসাহিত্যে অত্যন্ত শক্তিশালী। তবে “বত্রিশ দন্ত দেয় ফেলে” ঘটনাটি গবেষণামূলক দৃষ্টিতে সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। অনেক আলেম এই নির্দিষ্ট ঘটনাটিকে প্রামাণ্য হাদিস বা শক্তিশালী ঐতিহাসিক সূত্রে প্রতিষ্ঠিত বলেন না। তাই এই পঙ্ক্তিকে সরাসরি ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে নয়, বরং নবীপ্রেমের অতিশয়তা বোঝানো এক ভক্তিমূলক রূপক হিসেবে পাঠ করাই অধিক গ্রহণযোগ্য।
এখানে কবি-সাধক মূলত বলতে চেয়েছেন—প্রেম এমন এক শক্তি, যা মানুষকে নিজের আরাম, অহংকার, পরিচয়, এমনকি দেহগত স্বাচ্ছন্দ্যের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে। তবে ইসলামী শিক্ষার আলোকে আত্মক্ষতি নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, সুন্নাহর অনুসরণ, চরিত্রের পরিবর্তন এবং মানবসেবাই প্রকৃত প্রেমের বহিঃপ্রকাশ।
কালামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—
“ইমাম হোসেন শহিদ হল
দাস্তে ময়দান কারবালায়
নবীর প্রেমে পুত্র কুরবান দিল
জগত ফাতেমা।”
কারবালা ইসলামী ইতিহাসের এক গভীর শোক, আত্মত্যাগ ও নৈতিক দৃঢ়তার অধ্যায়। ইমাম হোসেন রা. কেবল রাজনৈতিক সংঘাতের এক চরিত্র নন; মুসলিম চেতনায় তিনি সত্য, ন্যায়, সাহস, নবীপরিবারের মর্যাদা এবং জুলুমের সামনে মাথা নত না করার প্রতীক। কালামে কারবালার উল্লেখ এসেছে নবীপ্রেমের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায়। এখানে “জগত ফাতেমা” বলতে হজরত ফাতেমা রা.-এর সন্তান, নবীপরিবারের প্রিয়তম ইমাম হোসেন রা.-এর আত্মত্যাগকে স্মরণ করা হয়েছে।
সুফি কালামে কারবালা শুধু ইতিহাস নয়; এটি প্রেমের পরীক্ষা। যে প্রেম শুধু মুখে থাকে, তা পরীক্ষায় টেকে না। আর যে প্রেম সত্যিকারের, তা অন্যায়ের সামনে নীরব থাকে না। ইমাম হোসেন রা.-এর শাহাদাত তাই প্রেমের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ককে জাগ্রত করে। প্রেম মানে শুধু কান্না নয়, প্রেম মানে সত্যের পাশে দাঁড়ানো।
এরপর কবি বলেন—
“দয়াল নবী পাগল ছিল
পীরানে পীর জীলানী
কাদরিয়া তরিকার দানে
জগৎ করে নূরানী।”
এখানে পীরানে পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী রহ.-এর উল্লেখ এসেছে। তিনি ইসলামী আধ্যাত্মিক জগতে কাদরিয়া তরিকার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে শ্রদ্ধেয়। তাঁর শিক্ষা, ওয়াজ, তাওবা, আত্মশুদ্ধি, আল্লাহভীতি, দরিদ্রপ্রেম এবং নবীপ্রেম শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছে। কালামে তাঁকে “দয়াল নবী পাগল” বলা হয়েছে—অর্থাৎ তিনি নবীপ্রেমে আত্মহারা, নবীজির আদর্শে নিবেদিত এবং আল্লাহমুখী জীবনের দিশারী।
“কাদরিয়া তরিকার দানে জগৎ করে নূরানী”—এই পঙ্ক্তি বোঝায়, প্রকৃত তরিকা মানুষের হৃদয়কে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যায়। তরিকার উদ্দেশ্য কোনো বাহ্যিক পরিচয় নয়; বরং নফসের সংশোধন, অন্তরের পরিশুদ্ধি, আল্লাহর জিকির, নবীপ্রেম, আদব এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করা।
শেষে বলা হয়েছে—
“চোরাকে কুতুব বানাইয়া
কেরামত প্রকাশিলে।”
এই পঙ্ক্তি সুফি দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে “চোর” বলতে কেবল বাহ্যিক অপরাধী বোঝানো হয়নি; বরং নফসের বন্দি, দুনিয়ার মোহে আটক, গাফলতে ডুবে থাকা মানুষকে বোঝানো হয়েছে। আর “কুতুব” সুফি পরিভাষায় আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব, অন্তরের উচ্চ মর্যাদা এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দার প্রতীক। অর্থাৎ, প্রকৃত পীর-মুর্শিদের সোহবত, তওবা, জিকির, আদব এবং নবীপ্রেম একজন পথভ্রষ্ট মানুষকেও আলোর মানুষে পরিণত করতে পারে।
এটাই এই কালামের সবচেয়ে মানবিক বার্তা—মানুষ বদলাতে পারে। যে হৃদয় আজ অন্ধকারে আছে, প্রেমের স্পর্শে সে হৃদয়ও নূরানী হতে পারে। যে মানুষ আজ গাফলতে আছে, নবীপ্রেমের মালা গলায় পরলে সে-ও মাওলার দিদারের পথে হাঁটতে পারে।
“প্রেম সাগরে ডুবছে আশেক” তাই শুধু একটি কালাম নয়; এটি এক আধ্যাত্মিক মানচিত্র। এখানে কোরআনের নির্দেশনা আছে, নবীপ্রেমের তত্ত্ব আছে, সাহাবায়ে কেরামের আত্মত্যাগ আছে, আহলে বাইতের কারবালার বেদনা আছে, পীরানে পীরের কাদরিয়া নূর আছে এবং মানুষের আত্মপরিবর্তনের আশা আছে।
এই কালাম আমাদের শেখায়—প্রেম মানে শুধু আবেগ নয়; প্রেম মানে অনুসরণ। প্রেম মানে শুধু গান নয়; প্রেম মানে চরিত্র। প্রেম মানে শুধু চোখের জল নয়; প্রেম মানে আত্মসমর্পণ। প্রেম মানে শুধু মাশুককে ডাকা নয়; প্রেম মানে নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা, গাফলত ও আত্মপ্রবঞ্চনাকে ডুবিয়ে দেওয়া।
আল্লাহর প্রেমের দাবি করলে দয়াল নবীর পথ ধরতে হবে। নবীপ্রেমের মালা গলায় পরতে হলে তাঁর সুন্নাহ, দয়া, আদব, সত্য, ক্ষমা, মানবিকতা ও আল্লাহমুখী জীবনকে নিজের জীবনে ধারণ করতে হবে। তখনই হৃদয়ে নূরের জ্যোতি জ্বলবে। তখনই আশেক প্রেম সাগরে ডুবে মাওলার দিদারের দিকে এগিয়ে যাবে।
এই অর্থে পীর নজরুল ইসলাম সাদকপুরী রহ.-এর “প্রেম সাগরে ডুবছে আশেক” বাংলা সুফি কালামধারায় প্রেম, মারেফত, নবীভক্তি ও মানবিক আত্মশুদ্ধির এক অনন্য দলিল। এটি গাওয়া যায়, শোনা যায়, চোখের পানি দিয়ে অনুভব করা যায়; কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা—এটি জীবন দিয়ে বোঝা যায়।
#প্রেমসাগর #আশেকেরপ্রেম #মাশুকেরদিদার #নবীপ্রেম #দয়ালনবী #নূরনবী #মাওলারদিদার #সুফিপ্রেম #আধ্যাত্মিকপ্রেম #কালামশরীফ #নজরুলীয়াদরবারশরীফ #পীরনজরুলইসলামসাদকপুরী #মাইজভান্ডারীপ্রেম #কাদরিয়াতরিকা #পীরানে_পীর #গাউছুলআজম #ইমামহোসেন #কারবালারশিক্ষা #ওয়াসকরনী #হানজালারপ্রেম #আল্লাহরপ্রেম #রাসুলপ্রেম #ইসলামিককালাম #বাংলাসুফিগান #প্রেমময়বাবানজরুল
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী