আজ বাবা ভাণ্ডারীর মহাপবিত্র ওরশ মোবারক
- মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী
২২শে চৈত্র | ৯০তম পবিত্র ওরশ শরীফ
হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভাণ্ডারী (ক.)—প্রেম, মারেফত ও আধ্যাত্মিকতার এক আলোকবর্তিকা
বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে কিছু কিছু দিন এমন আছে, যেগুলো কেবল স্মৃতির দিন নয়—বরং হৃদয়ের জাগরণের দিন, প্রেমের নবায়নের দিন এবং আত্মার পরিশুদ্ধির দিন। তেমনই এক মহিমান্বিত দিন হলো ২২শে চৈত্র, যেদিন পালন করা হয় হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভাণ্ডারী (ক.)-এর পবিত্র ওরশ শরীফ। ২০২৬ সালে পালিত হচ্ছে তাঁর ৯০তম পবিত্র ওরশ মোবারক, যা আধ্যাত্মিক জগতের জন্য এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহাসিক মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে এই ওরশ শরীফ প্রতি বছর লাখো আশেক-ভক্তের মিলনমেলায় পরিণত হয়। এই দিনটি শুধু একজন মহান ওলির ওফাত দিবস নয়; বরং তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন, শিক্ষা ও প্রেমের ধারার পুনরুজ্জীবনের দিন।
১. ওরশ: মৃত্যু নয়, মিলনের দিন
ইসলামী সুফি দর্শনে “ওরশ” শব্দের অর্থ “বিবাহ” বা “মিলন”। অর্থাৎ, একজন ওলির ওফাত দিবসকে মৃত্যু হিসেবে দেখা হয় না; বরং আল্লাহর সান্নিধ্যে তাঁর চূড়ান্ত মিলনের দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাবা ভাণ্ডারী (ক.)-এর ওরশ হলো তাঁর পার্থিব জীবন থেকে আখিরাতের অনন্ত জীবনে উত্তরণের পবিত্র স্মরণ।
১৯৩৭ সালের ২২শে চৈত্র (বাংলা ১৩৪৩)—এই দিনেই তিনি ওফাত লাভ করেন। সেই থেকে প্রতি বছর এই দিনটি তাঁর ওরশ শরীফ হিসেবে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।
২. মাইজভাণ্ডার দরবার: আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রভূমি
বাংলাদেশের সুফি ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ। এটি শুধু একটি দরবার নয়; বরং একটি আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে—
* প্রেম (মহাব্বত)
* মারেফত (আল্লাহর পরিচয়)
* আদব (শিষ্টাচার)
* ইবাদত (আল্লাহর স্মরণ)
* এবং মানবতার সেবা
এই পাঁচটি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করে একটি আধ্যাত্মিক জীবন গড়ে তোলা হয়।
হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভাণ্ডারী (ক.) এই ধারার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি তাঁর জীবন, কর্ম ও শিক্ষা দিয়ে অসংখ্য মানুষকে আল্লাহমুখী করেছেন।
৩. বাবা ভাণ্ডারী (ক.): আধ্যাত্মিক পরিচয় ও মর্যাদা
তিনি সুফি জগতে পরিচিত ছিলেন—
* হুজুরে গাউসুল আজমের সিলসিলার একজন বিশিষ্ট খলিফা হিসেবে
* নূরে রহমান ও মাওলায়ে রহমানের প্রেমধারার ধারক হিসেবে
* মাইজভাণ্ডারী তরিকার এক গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে
তাঁর জীবন ছিল—
* আল্লাহপ্রেমে নিমগ্ন
* নবীপ্রেমে উজ্জ্বল
* মানবসেবায় নিবেদিত
* এবং আত্মশুদ্ধির অনন্য দৃষ্টান্ত
তাঁর দরবার ছিল আশ্রয়হীনদের আশ্রয়, পথহারা মানুষের পথপ্রদর্শন এবং আত্মিক শান্তির কেন্দ্র।
৪. তাঁর শিক্ষা: প্রেমই পথ, প্রেমই মুক্তি
বাবা ভাণ্ডারী (ক.)-এর আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূল কেন্দ্র ছিল “প্রেম”—বিশেষ করে—
* আল্লাহর প্রতি প্রেম
* রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি প্রেম
* মানুষের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা
তিনি শিখিয়েছেন—
👉 ধর্ম কেবল বিধান নয়, এটি অনুভব
👉 ইবাদত কেবল রীতি নয়, এটি ভালোবাসা
👉 মানুষকে ভালোবাসা ছাড়া আল্লাহর প্রেম পূর্ণ হয় না
তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী, একজন মুমিনের হৃদয় হতে হবে—
* বিনয়ী
* সহনশীল
* ক্ষমাশীল
* এবং আল্লাহর স্মরণে সজীব
৫. ওরশের তাৎপর্য: আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ
ওরশ শরীফ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন। এই দিনকে কেন্দ্র করে—
* জিকির ও আজকার অনুষ্ঠিত হয়
* কোরআন তেলাওয়াত করা হয়
* মিলাদ ও দোয়া মাহফিল হয়
* সুফি কালাম ও গজল পরিবেশিত হয়
* দরবারে আশেক-ভক্তদের সমাগম ঘটে
এই সবকিছু মিলিয়ে একটি রূহানী পরিবেশ তৈরি হয়, যা মানুষের অন্তরে পরিবর্তন আনে।
৬. ৯০তম ওরশ: ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতার প্রতীক
৯০তম ওরশ শরীফ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়; বরং প্রায় এক শতাব্দী ধরে একটি আধ্যাত্মিক ধারার অব্যাহত প্রবাহের প্রতীক।
এই দীর্ঘ সময়ে—
* হাজার হাজার মানুষ এই দরবার থেকে আধ্যাত্মিক দীক্ষা নিয়েছে
* অসংখ্য হৃদয় নবীপ্রেমে জাগ্রত হয়েছে
* সমাজে মানবতা, সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে পড়েছে
এই ওরশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন সত্যিকারের ওলির প্রভাব তাঁর মৃত্যুর পরও থেমে যায় না; বরং আরও বিস্তৃত হয়।
৭. সমকালীন প্রেক্ষাপটে ওরশের গুরুত্ব
আজকের পৃথিবীতে যেখানে—
* বিভাজন বাড়ছে
* সহিংসতা বৃদ্ধি পাচ্ছে
* মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে
সেখানে বাবা ভাণ্ডারী (ক.)-এর শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
তিনি যেন আজও আহ্বান জানাচ্ছেন—
👉 ঘৃণা নয়, ভালোবাসা ছড়াও
👉 অহংকার নয়, বিনয় শেখো
👉 বিভাজন নয়, ঐক্য গড়ো
👉 বাহ্যিকতা নয়, অন্তরের পরিশুদ্ধি অর্জন করো
৮. আধ্যাত্মিক উপলব্ধি: ওরশ আমাদের কী শেখায়?
এই পবিত্র ওরশ শরীফ আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে—
✔ জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আমল চিরস্থায়ী
✔ আল্লাহর পথে চলাই জীবনের মূল উদ্দেশ্য
✔ নবীপ্রেম ছাড়া ঈমান পূর্ণতা পায় না
✔ ওলিদের অনুসরণ মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করে
✔ হৃদয়কে শুদ্ধ না করলে বাহ্যিক ইবাদত অসম্পূর্ণ
উপসংহার
২২শে চৈত্র, ৯০তম পবিত্র ওরশ মোবারক—এ শুধু একটি তারিখ নয়; এটি প্রেমের ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতার আলোকবর্তিকা এবং আত্মার জাগরণের আহ্বান।
হযরত সৈয়দ গোলামুর রহমান বাবাভাণ্ডারী (ক.) তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন—
আল্লাহকে পেতে হলে হৃদয়কে প্রেমে ভরাতে হয়,
মানুষকে ভালোবাসতে হয়,
এবং নবীজির আদর্শকে জীবনে ধারণ করতে হয়।
এই পবিত্র দিনে আমাদের দোয়া হোক—
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রেমে উদ্বুদ্ধ করুন,
আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন,
এবং আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।
আমিন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী