মহাকালের কাঠগড়ায় ত্রয়োদশ সংসদ
- আশরাফুল আলম তাজ
ভূমিকা: স্থাপত্য বনাম চেতনা
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন কেবল একটি সংসদীয় আনুষ্ঠানিকতার সূচনা ছিল না; বরং এটি ছিল জাতির আত্মপরিচয়ের দর্পণে এক অস্বস্তিকর ছায়া। সংসদ ভবন কেবল কংক্রিটের কোনো স্থাপত্য নয়; এটি একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘ সংগ্রাম এবং অগণিত প্রাণের আত্মত্যাগের স্মারক। যখন এই পবিত্র প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রসত্তার মূল স্তম্ভগুলোর প্রতি অনীহা বা অস্বস্তি পরিলক্ষিত হয়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের ধারায় এক বিজাতীয় বিচ্যুতি।
রাষ্ট্রীয় প্রতীকের মহিমা: আনুগত্যের অগ্নিপরীক্ষা
একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সমান্তরাল প্রতীক হলো তার জাতীয় সংগীত ও পতাকা। সংসদ কক্ষে যখন জাতীয় সংগীত ধ্বনিত হয়, তখন তা কেবল একটি সুর নয়, বরং একটি জাতির লড়াইয়ের মহাকাব্য। এই সুরের সামনে দাঁড়িয়ে দোদুল্যমানতা বা অনীহা প্রদর্শন করা ব্যক্তির আচরণের দৈন্য নয়, বরং তা রাষ্ট্রের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের অভাবকে ইঙ্গিত করে। স্বাধীনতার স্মারক ও প্রতীকের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন প্রকারান্তরে সেই রক্তস্নাত ইতিহাসকেই অস্বীকার করার শামিল, যা এই সংসদের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে।
ইতিহাসের স্থপতি ও নীরবতার রাজনীতি
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্য হলো, একে মুছে ফেলা যায় না, কেবল সাময়িকভাবে আড়াল করা যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর নাম যখন সংসদের প্রথম অধিবেশনে অনুচ্চারিত থাকে, তখন সেই নীরবতা শব্দের চেয়েও বেশি উচ্চকিত হয়ে ওঠে।
একটি জাতির মুক্তিদাতার নাম কোনো দলীয় সম্পদ নয়, বরং তা জাতীয় ঐক্যের সূত্র। ইতিহাসের এই সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দুকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কেবল একটি নামের অনুল্লেখ নয়, বরং এটি একটি জাতির শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নামান্তর। যে কণ্ঠস্বর একদা সাত কোটি মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর করেছিল, সেই কণ্ঠের অবমাননা বা তাকে ঘিরে নীরবতা গণতন্ত্রের প্রকৃত সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইতিহাসের সঙ্গে এই অস্বচ্ছ সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকে এক পরিচয়হীন সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
সংসদীয় শিষ্টাচার: বহুত্বের মাঝে ঐক্য
গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব এর বহুত্ববাদে। সংসদে ভিন্নমত থাকবে, আদর্শিক সংঘাত থাকবে এবং থাকবে তীক্ষ্ণ বিতর্ক। কিন্তু এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকতে হয় রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি ও ইতিহাসের ধ্রুবসত্যগুলোর প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা। সংসদ কেবল বর্তমানের নীতি নির্ধারণ করে না, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নৈতিকতার মানদণ্ড তৈরি করে। যখন সেই মানদণ্ডেই ফাটল ধরে, তখন জাতীয় সংহতি হুমকির মুখে পড়ে।
উপসংহার: মহাকালের বিচার
ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম এবং একইসাথে সত্যনিষ্ঠ। আজকের প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি আচরণ এবং প্রতিটি বিচ্যুতি মহাকালের পাতায় খোদিত হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার চেতনা কোনো স্থবির স্মৃতি নয়, বরং এটি একটি প্রবহমান জীবনদর্শন। সংসদীয় অঙ্গনে সেই চেতনার মর্যাদা রক্ষা করা কেবল গতানুগতিক ঐতিহ্য নয়, বরং একটি পরিণত জাতি হিসেবে নিজেদের টিকিয়ে রাখার আবশ্যিক শর্ত।
রাষ্ট্রীয় প্রতীক, ইতিহাসের দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ—এই তিনের সমন্বয়েই একটি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড গঠিত হয়। ত্রয়োদশ সংসদের এই সূচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন যেন কখনোই জাতীয় অস্তিত্বের মূল ভিত্তিগুলোকে নড়বড়ে না করে। কারণ, যে জাতি তার ইতিহাসকে ধারণ করতে ভয় পায়, তার ভবিষ্যৎ কখনোই কণ্টকমুক্ত হয় না।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী