গানে, প্রেমে জজবায় প্রেমময় বাবা নজরুল (পর্ব ৮),
– মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী
পর্ব – ৮ | “সাল্লুছার মাদা আহমাদা ইয়া আহমাদা”
বাংলার আধ্যাত্মিক সাধনা ও সূফী ঐতিহ্যের ধারায় বহু যুগশ্রেষ্ঠ সাধকের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁদের সাধনা, প্রেম এবং আধ্যাত্মিক জজবার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আল্লাহ ও রাসূলের প্রেম জাগ্রত হয়েছে। এই ধারার অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন কুমিল্লা বুড়িচং “নজরুলীয়া দরবার শরীফ”-এর প্রতিষ্ঠাতা যুগশ্রেষ্ঠ সূফী সাধক, আধ্যাত্মিক লেখক ও গবেষক, ছানিয়ে রুমি, খলিফায়ে গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী, আল্লামা পীর নজরুল ইসলাম সাদকপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বাবাজান কেবলা।
তাঁর আধ্যাত্মিক রচনা, কালাম ও গজলসমূহ শুধু সঙ্গীত নয়—এগুলো মূলত ইশকে রাসূল (সা.)-এর গভীর প্রেমময় প্রকাশ। তাঁর লেখা কালামগুলোতে একদিকে যেমন কোরআন-হাদিসের ইঙ্গিত রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে সূফী দর্শনের গভীর ব্যাখ্যা।
এই ধারার একটি অনন্য সৃষ্টি হলো তাঁর রচিত কালাম
“সাল্লুছার মাদা আহমাদা ইয়া আহমাদা”।
কালামের পাঠ
সাল্লুছার মাদা আহমাদা ইয়া আহমাদা
মারহাবা মারহাবা ইয়া নূরে খোদা।
তোমারী নুরের ঝলক লাগিয়া
গেল মাবুদের পরিচয় হইয়া
মারহাবা মারহাবা ইয়া নূরে খোদা। ঐ
না হইত জমিন না হইত আছমান
না হইত সৃষ্টি জ্বীন আর ইনছান
তোমারে খাতিরে সকলি পয়দা। ঐ
হুর পরী আর সৃষ্টি যত
তোমার দুরুদ পড়ে অবিরত
তোমার গুণের নাই যে অন্ত
তোমার প্রশংসা করে স্বয়ং খোদা। ঐ
কালামের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
এই কালামের মূল কেন্দ্রবিন্দু হল নূরে মুহাম্মদী তত্ত্ব। সূফী দর্শনে বিশ্বাস করা হয়, সৃষ্টির সূচনায় সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন নূরে মুহাম্মদী—অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নূর। এই নূর থেকেই পরবর্তীতে সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রকাশ ঘটে।
কালামের প্রথম পংক্তি:
“সাল্লুছার মাদা আহমাদা ইয়া আহমাদা
মারহাবা মারহাবা ইয়া নূরে খোদা।”
এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে “নূরে খোদা” বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এটি কোনো উপমা নয়, বরং সূফী দৃষ্টিতে তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রতীক। “মারহাবা” শব্দটি আনন্দ, সম্মান ও ভালোবাসার অভিব্যক্তি।
নূরের ঝলক ও সৃষ্টির রহস্য
কালামের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে—
“তোমারী নুরের ঝলক লাগিয়া
গেল মাবুদের পরিচয় হইয়া”
এখানে বোঝানো হয়েছে, নবী করিম (সা.)-এর নূরের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর পরিচয় লাভ করে। ইসলামের ইতিহাসে নবী মুহাম্মদ (সা.) হলেন সেই মহান সত্তা যার মাধ্যমে মানবজাতি তাওহীদের পূর্ণ শিক্ষা লাভ করেছে।
সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও নবীর মর্যাদা
কালামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ—
“না হইত জমিন না হইত আছমান
না হইত সৃষ্টি জ্বীন আর ইনছান
তোমারে খাতিরে সকলি পয়দা।”
এই পংক্তিতে একটি সুপরিচিত সূফী ভাবধারা প্রতিফলিত হয়েছে। বিভিন্ন আধ্যাত্মিক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে—
“লাওলাকা লামা খালাকতুল আফলাক”
অর্থাৎ, “হে প্রিয় নবী! আপনাকে সৃষ্টি না করলে আমি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতাম না।”
যদিও এটি হাদিস হিসেবে বিতর্কিত, কিন্তু সূফী ব্যাখ্যায় এর অর্থ হলো—নবী মুহাম্মদ (সা.) হলেন সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও পরিপূর্ণতার প্রতীক।
দুরুদ ও প্রশংসার মহিমা
কালামের শেষ অংশে বলা হয়েছে—
“হুর পরী আর সৃষ্টি যত
তোমার দুরুদ পড়ে অবিরত”
কোরআনে বলা হয়েছে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর উপর দুরুদ পাঠ করেন।”
(সূরা আহযাব: ৫৬)
এই আয়াতের ভাবধারাই এখানে কাব্যিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাৎ শুধু মানুষ নয়—সমগ্র সৃষ্টি নবী করিম (সা.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করে।
সূফী সাহিত্যিক দৃষ্টিতে কালামের মূল্য
এই কালামটি শুধু ধর্মীয় সংগীত নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক কবিতা। এর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
১. প্রেমভিত্তিক ভাষা
রাসূল প্রেমকে কেন্দ্র করে সূফী কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
২. প্রতীকী ব্যঞ্জনা
“নূর”, “মারহাবা”, “দুরুদ”—এসব শব্দ গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে।
৩. সহজ ভাষায় গভীর দর্শন
কালামটি সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী হলেও এর মধ্যে রয়েছে সূফী দর্শনের গভীরতা।
নজরুলীয়া দরবার শরীফ ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য
কুমিল্লার বুড়িচংয়ে প্রতিষ্ঠিত নজরুলীয়া দরবার শরীফ আজ বহু মুরিদ-মুহিব্বানের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। এখানে জিকির, ফিকির, কালাম ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহ ও রাসূলের প্রেমের দিকে আহ্বান করা হয়।
আল্লামা পীর নজরুল ইসলাম সাদকপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বাবাজান কেবলার রচনাগুলো এই দরবারের আধ্যাত্মিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
উপসংহার
“সাল্লুছার মাদা আহমাদা ইয়া আহমাদা” শুধু একটি কালাম নয়—এটি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর প্রেম, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক অনন্য প্রকাশ।
এই কালামের প্রতিটি পংক্তি মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে ইশকে রাসূল, আর মনে করিয়ে দেয়—
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসাই হলো ঈমানের পূর্ণতার অন্যতম শর্ত।
সূফী সাধকরা যুগে যুগে এই প্রেমের শিক্ষা দিয়েছেন, আর সেই ধারারই এক উজ্জ্বল প্রকাশ এই কালাম।
#গানে_প্রেমে_জজবায় #প্রেমময়_বাবা_নজরুল #পীর_নজরুল_ইসলাম_সাদকপুরী #নজরুলীয়া_দরবার_শরীফ #সূফী_সাধনা #ইশকে_রাসূল #আধ্যাত্মিক_সাহিত্য #সূফী_কালাম #সাল্লুছার_মাদা_আহমাদা #ইয়া_আহমাদা #দরুদ_ও_সালাম #নূরে_মুহাম্মদী #ইসলামিক_সংস্কৃতি #বাংলার_সূফী_ঐতিহ্য #আধ্যাত্মিক_গবেষণা #দরবারি_কালাম #মাইজভান্ডারী_ধারা #ইসলামিক_সাহিত্য #আল্লাহ_ও_রাসূলের_প্রেম #বাংলা_ইসলামিক_লেখা ✨
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী