৭ মার্চ: তর্জনীর হুংকারে শৃঙ্খলমুক্তির মহাকাব্য
- আশরাফুল আলম তাজ
ইতিহাসের কিছু মাহেন্দ্রক্ষণ ক্যালেন্ডারের জীর্ণ পাতা ছিঁড়ে মহাকালের ললাটে অক্ষয় তিলক হয়ে এঁটে যায়। ৭ মার্চ তেমনই এক অবিনাশী দিন—যা কেবল একটি শুষ্ক তারিখ নয়, বরং এক পরাধীন জাতির ধমনিতে বয়ে চলা আজন্ম দহনের চূড়ান্ত আগ্নেয়-বিস্ফোরণ। ১৯৫২-র রক্তঋণ আর ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সবটুকু সঞ্চিত তেজ পুঞ্জীভূত হয়েছিল ১৯৭১ সালের সেই তপ্ত বিকেলে, ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানের ঘাসে।
সেদিন ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল এক জাদুকরী বজ্রকণ্ঠে। লক্ষ লক্ষ মানুষের বিক্ষুব্ধ হৃদস্পন্দন যেন লীন হয়ে গিয়েছিল সেই উত্থিত তর্জনীর ইশারায়। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন মঞ্চে দাঁড়ালেন, তখন তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক পুরুষ ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাত কোটি শোষিত আত্মার পুঞ্জীভূত আর্তনাদ এবং আগামীর স্বপ্নের এক 'পলিফোনিক সিম্ফনি'।
তাঁর মুখনিঃসৃত প্রতিটি শব্দ ছিল এক একটি অগ্নিগোলক—যা মুহূর্তেই ভস্মীভূত করেছিল দীর্ঘ বঞ্চনার গ্লানি। সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা:
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
এই একটি অব্যর্থ পঙ্ক্তিতেই নিহিত ছিল এক নিরস্ত্র জাতিকে দুর্ধর্ষ যোদ্ধায় রূপান্তরিত করার অলৌকিক রসায়ন। কোনো লিখিত পাণ্ডুলিপি ছাড়াই তিনি সেদিন বুনেছিলেন বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা। সেই ভাষণে ছিল না কোনো করুণা-ভিক্ষা, ছিল না কোনো পঙ্গু আপস; বরং ছিল শোষকের চোখে চোখ রেখে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এক চূড়ান্ত ও কঠোর আল্টিমেটাম।
২০১৭ সালে ইউনেস্কো এই ঐতিহাসিক ভাষণকে “মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড” রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বমানবতার প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র মানবজাতির সংগ্রাম ও মুক্তির ইতিহাসের এক অনন্য সম্পদ।
সেদিন রেসকোর্সের মঞ্চ থেকে কোনো সাধারণ বক্তৃতা বের হয়নি, বেরিয়েছিল এক কালজয়ী মানচিত্র। সেই তর্জনী কেবল আকাশকে শাসন করেনি, শাসন করেছিল পরাধীনতার নিয়তিকে। আজ ৫৩ বছর পরও—২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে—সেই কণ্ঠস্বর আমাদের ধমনিতে লাভার মতো প্রবাহিত হয়; আজও শিখিয়ে দিয়ে যায়—বাঙালিকে দবায়ে রাখা যায় না।
যতদিন এই বদ্বীপের বুকে সূর্য উদিত হবে, ততদিন সেই বজ্রকণ্ঠ আমাদের রক্তে সাহসের প্লাবন হয়ে বয়ে চলবে। আমাদের অস্তিত্বের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেই হুংকার অনুরণিত হয়ে মনে করিয়ে দেবে—বাঙালির স্বভাবে বিনয় থাকতে পারে, কিন্তু বিনাশী শক্তির সামনে মাথানত করার কোনো জায়গা নেই।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী