"একুশের চেতনা: সত্য, সংগ্রাম ও ছদ্মবেশের মুখোশ উন্মোচন"
- আশরাফুল আলম তাজ
উপক্রমণিকা: মহাকালের ললাটে রক্ততিলক
ইতিহাসের তটভূমিতে কালবৈশাখীর প্রলয় আসে বারবার, কিন্তু কিছু মুহূর্ত মহাকালের জীর্ণতাকে তুচ্ছ করে স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল পঞ্জিকার একটি শুষ্ক তারিখ নয়; এটি একটি জাতির অবদমিত আত্মার অবিনাশী হাহাকার এবং শৃঙ্খলমুক্তির প্রথম দীপ্ত হুঙ্কার। একুশ হলো বাঙালির অস্তিত্বের সেই বীজতলা, যেখানে রোপিত হয়েছিল এক সাগর রক্তের বিনিময়ে কেনা স্বাধীনতার স্বপ্নবৃক্ষ। এটি বাঙালির স্বাধিকার চেতনার এক অলৌকিক অগ্নিপর্ব—যেখানে শব্দ আর রক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
প্রেক্ষাপট: সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ ও তিমির হননের সংকল্প
১৯৪৭-এর দেশভাগ যখন মানচিত্রের শরীরে কৃত্রিম কাঁটাতারের ক্ষত এঁকে দিল, তখন শাসকের উগ্র আধিপত্যবাদ চাইল একটি জাতির কণ্ঠনালিকে স্তব্ধ করে দিতে। সংখ্যাগরিষ্ঠের মাতৃভাষাকে অস্বীকার করে যখন উর্দুকে ‘একমাত্র’ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার স্পর্ধা দেখানো হলো, তখন তা কেবল রাজনৈতিক সংঘাত রইল না—তা হয়ে উঠল অস্তিত্বের লড়াই। ভাষা তো কেবল ধ্বনিসমষ্টি নয়, ভাষা হলো একটি জাতির সহস্র বছরের লালিত স্বপ্ন, স্মৃতি আর সংগ্রামের আধার। সেই আধারকে চূর্ণ করার অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে যে প্রতিবাদের মেঘ জমেছিল, তা ছিল মূলত সাংস্কৃতিক বিজাতীয়করণের বিরুদ্ধে তিমির হননের এক মহতী সংকল্প।
নন্দনতাত্ত্বিক দ্রোহ: অক্ষরের রক্তস্নান
একুশ ছিল ভাষার অলঙ্কারের ওপর শাসকের নগ্ন থাবার প্রতিবাদ। যে বর্ণমালা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে ঝংকৃত হয়েছে, যে অক্ষর কাজী নজরুল ইসলামকে করেছে বিদ্রোহী—সেই অক্ষরকে যখন শৃঙ্খলিত করার ষড়যন্ত্র হলো, তখন বাঙালি বুঝতে পারল ভাষা হারানো মানে হলো তার জাতির আত্মাকে হারানো। একুশ তাই কেবল মিছিলের নাম নয়, একুশ হলো শব্দশৈলীর পবিত্রতা রক্ষার এক নন্দনতাত্ত্বিক সংগ্রাম। বাংলা বর্ণমালার প্রতিটি বাঁক সেদিন যেন একেকটি তরবারি হয়ে শাসকের সিংহাসন লক্ষ্য করে ধেয়ে গিয়েছিল। পিচঢালা পথে চুইয়ে পড়া সেই তপ্ত লোহিত ধারা যেন হয়ে উঠল এক একটি জীবন্ত বর্ণমালা।
আমতলার অগ্নিগর্ভ ও বুলেটের নীল দংশন
২০ ফেব্রুয়ারির সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠক এবং অতঃপর ২১ ফেব্রুয়ারির কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। আমতলার প্রতিটি ধূলিকণা সেদিন সাক্ষ্য দিচ্ছিল এক আসন্ন ঝড়ের। হাজার হাজার কণ্ঠে তখন একটাই ধ্বনি—"রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই"। মিছিলে শামিল হয়েছিল পোগোজ স্কুলের কিশোর থেকে শুরু করে অদম্য সাহসী জাহানারা লাইজুর মতো তেজস্বিনী কন্যারা। অতঃপর সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত! ঘাতকের বন্দুকের নল থেকে ছুটে আসা তপ্ত সিসা কেড়ে নিল আব্দুল জব্বার, আব্দুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত আর শফিউর রহমানের প্রাণ। সেই রক্ত ছিল না পরাজয়ের প্রতীক; তা ছিল শোষিতের চূড়ান্ত বিজয়ের ইশতেহার।
আদর্শিক বিচ্যুতি ও ছদ্মবেশী রাজনীতির কুহক
কিন্তু ইতিহাসের এই রক্তপিচ্ছিল পথে আজ এক বিচিত্র ও কদর্য উপহাসের ছায়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। একুশের চেতনা যেখানে আপসহীনতার মন্ত্র শেখায়, সেখানে আজ ক্ষমতার সমীকরণে জন্ম নিচ্ছে চরম সুবিধাবাদ। যারা দীর্ঘকাল একুশের এই পুষ্পার্ঘ্য অর্পণকে ধর্মীয় অপব্যাখ্যায় 'নাজায়েজ' বা 'শিরক' বলে ফতোয়া দিয়েছিল, আজ রাজনৈতিক বৈতরণী পার হতে তারাই শহীদ মিনারের পবিত্র বেদীতে পুষ্পস্তবক হাতে দাঁড়িয়েছে। সংসদের বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নিজেদের অতীত অবস্থানকে সুকৌশলে আড়াল করে এই যে 'জায়েজ' করার মহড়া—তা মূলত এক আদর্শিক ভণ্ডামি। গতাকলে শহীদ মিনারে সাংবাদিকদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যে চতুরতা তারা দেখিয়েছে, তা প্রমাণ করে তাদের এই শ্রদ্ধা নিবেদন হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে নয়, বরং রাজনীতির এক কৌশলী ছদ্মবেশ মাত্র। একুশের অবিনাশী চেতনা কোনো সাময়িক কৌশলের হাতিয়ার হতে পারে না; যারা এই রক্তস্নাত ইতিহাসকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে, তারা মূলত বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্গেই প্রতারণা করছে।
চেতনার স্থাপত্য: স্মৃতির অক্ষয় শিখা ও আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তি
রক্তস্নাত সেই বিকেলের অব্যবহিত পরেই জেগে উঠল প্রথম শহীদ মিনার—বাঙালির হৃদপিণ্ডের এক দৃশ্যমান স্থাপত্য। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে উঠল বাঙালির চেতনার প্রতীক। এটি কেবল ইট-বালুর কাঠামো নয়, এটি হলো শোককে শক্তিতে রূপান্তরের এক অনন্য শিল্পকলা। একুশের সেই শিখা ১৯৫৬-র সংবিধানে স্বীকৃতির মর্যাদা পেল, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে প্রেরণা জোগাল এবং পরিশেষে ১৯৭১-এর রণাঙ্গনে মুক্তিকামী মানুষের হাতে তুলে দিল বিজয়ের জয়মাল্য। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মাধ্যমে আজ সেই একুশ বিশ্বজনীন; আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মুকুট পরে তা আজ মানবতার অধিকারে পরিণত হয়েছে।
উপসংহার: শাশ্বত একুশ ও আগামীর অঙ্গীকার
একুশ আমাদের শিখিয়েছে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানোর মন্ত্র। একুশ মানেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা এক অক্ষয় বীরত্ব। যারা আজাদী, ইনসাফ আর ইনকিলাবের কথা বলেন, তাদের অনুভবের মূলে থাকতে হবে এই রক্তস্নাত ইতিহাস। একুশ কোনো অতীত স্মৃতি নয়, এটি এক প্রবহমান শপথ; এটি কোনো শোকগাথা নয়, এটি চিরন্তন জাগরণের এক মহাকাব্য। যতদিন বাংলার আকাশে সূর্য উঠবে, যতদিন পদ্মা-মেঘনা-যমুনার স্রোত বহমান থাকবে, ততোদিন অমর একুশের সেই অবিনাশী চেতনা প্রতিটি বাঙালির হৃদস্পন্দনে ঝঙ্কৃত হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী