উপাসনালয় হোক উৎসবমুখর সার্বজনীন, মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী
ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও দল-মত বিভাজনে হারিয়ে যাচ্ছে উপাসনালয়ের প্রাণ
উডল্যান্ড, সিঙ্গাপুর | ০২ জুন ২০২৩
বর্তমান বিশ্বে ধর্মের নামে সংঘাত, বিদ্বেষ ও সহিংসতার খবর নতুন কিছু নয়। বিস্ময়কর হলেও সত্য—আজ ধর্মের প্রধান শত্রু অনেক ক্ষেত্রেই বাইরের কেউ নয়, বরং ধর্মের নামধারী কিছু মানুষ নিজেরাই। ভিন্ন মত, ভিন্ন পথ কিংবা ভিন্ন আচার-অনুশীলনকে কেন্দ্র করে একে অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, উপহাস এমনকি জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে কোথাও কোথাও ধর্মের নামে মিটিং-মিছিল, সংঘর্ষ, এমনকি খুন-মার্ডারের ঘটনাও ঘটছে—যা কোনো সভ্য সমাজের জন্যই কাম্য নয়।
প্রশ্ন উঠছে—একজন মানুষ যদি নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী পথ বেছে নেন, তাতে অন্যের এত ক্ষোভ কেন? কেউ যদি স্বেচ্ছায় ভিন্ন কোনো বিশ্বাসে চলেন, তাহলে তাকে ‘শুদ্ধ’ পথে আনার দায়িত্ব কে আপনাকে দিল? স্বর্গে নেওয়ার নাম করে মানুষ খুন করার নৈতিক অধিকারই বা কার?
দল-মতের বিভাজন ও স্রষ্টার সর্বশক্তিমান ধারণা
যারা বিশ্বাস করেন—এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা একজন এবং তিনি সর্বশক্তিমান—তাদের একটি বিষয় গভীরভাবে ভাবা দরকার। যদি স্রষ্টা চাইতেন, তবে তিনি নিশ্চয়ই সমগ্র মানবজাতিকে একই মত, একই পথে পরিচালিত করতে পারতেন। সেক্ষেত্রে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান; সুন্নি, শিয়া, আহলে হাদিস, আহলে কোরআন; বাউল, ফকির, সাধু, বৈষ্ণব—এত ভিন্নতা থাকত না। সবাই একই বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেত।
অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। এই বহুত্বই প্রমাণ করে—ভিন্নতা সৃষ্টির মধ্যেই স্রষ্টার ইচ্ছা ও পরীক্ষা নিহিত। আর সেই ভিন্নতার ভেতর সহনশীলতা ও মানবিকতা চর্চাই হওয়া উচিত ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা।
তালাবদ্ধ উপাসনালয় ও হারিয়ে যাওয়া মানুষ
সমাজের এক বেদনাদায়ক চিত্র আজ চোখে পড়ছে—বহুতল, টাইলস-মার্বেল ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক উপাসনালয়গুলো ক্রমেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। কোথাও পাঁচতলা মসজিদে নামাজ শেষে পাঁচজন মানুষও থাকেন না। নামাজের আগে ও পরে অধিকাংশ সময় মসজিদ তালাবদ্ধ থাকে। প্রশ্ন হলো—এত ব্যয়বহুল ও দৃষ্টিনন্দন উপাসনালয় থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন সরে যাচ্ছে?
এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসে দল-মত বিভাজন। যে এলাকায় যে দলের প্রভাব বেশি, সে দলের বাইরে অন্য মতের মানুষ সেখানে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কেউ গেলে তাকে ভালো চোখে দেখা হয় না—এমন ধারণা ও অভিজ্ঞতা বহু মানুষের। ফলে উপাসনালয় ধীরে ধীরে সার্বজনীন চরিত্র হারিয়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জায়গায় পরিণত হচ্ছে।
ধর্ম, মানবতা ও সহনশীলতার প্রশ্ন
অথচ স্রষ্টা যখন দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে আলো, বাতাস, পানি, ফলমূল ও জীবনের সব মৌলিক চাহিদা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন, তখন মানুষ কেন একে অন্যের প্রতি সহনশীল হতে পারে না? কেন ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ানো হয়, বিভাজন তৈরি করা হয়?
বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন বাণী—
“মানুষ মানুষের জন্য”,
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”—
এই কথাগুলো যেন আজ কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ।
উৎসবমুখর সার্বজনীন উপাসনালয়ের আহ্বান
ধর্মের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষকে নৈতিক, মানবিক ও শান্তিপ্রিয় করে তোলা—তবে উপাসনালয় হওয়া উচিত ভয়মুক্ত আশ্রয়। এমন জায়গা, যেখানে মানুষ দল-মত নয়, মানুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। যেখানে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষকেও ঘৃণা নয়, সম্মান দেখানো হবে।
উপাসনালয় কেবল ইবাদতের জায়গা নয়—এটি হতে পারে মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতির কেন্দ্র। শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ—সবাই যেন সেখানে মানসিক শান্তি ও সামাজিক বন্ধনের স্বাদ পায়।
উপসংহার
ধর্মের নামে বিভাজন নয়, প্রয়োজন সংযোগ। ঘৃণা নয়, দরকার সহানুভূতি। ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, চাই আত্মশুদ্ধি। আজ সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—আমরা ধর্মকে কীভাবে ব্যবহার করছি এবং কোথায় ভুল করছি।
আসুন, মানবতাকে সর্বাগ্রে রেখে সহনশীলতার চর্চা করি। সমাজ, সংসার ও উপাসনালয়গুলোকে করে তুলি সত্যিকার অর্থেই উৎসবমুখর ও সার্বজনীন।
মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী
সম্পাদক
আমাদের চ্যানেল
অনলাইন নিউজ পোর্টাল
#উপাসনালয়_হোক_সার্বজনীন #HumanityFirst #মানুষ_মানুষের_জন্য #RespectAllFaiths #ধর্ম_মানবতার_জন্য #ReligiousTolerance #NoHateNoViolence #PeacefulCoexistence #UnityInDiversity #StopReligiousHatred #FaithAndHumanity #InterfaithHarmony #সবার_উপরে_মানুষ_সত্য #UniversalWorship #ReligionForPeace #BuildBridgesNotWalls
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী