অগ্নিগর্ভ ভূরাজনীতি ও মদমত্ত নেতৃত্ব: এক বিপন্ন সভ্যতার আসন্ন গোধূলি
শব্দে সময়কে প্রশ্নকারী এক নাগরিক কন্ঠ
— আশরাফুল আলম তাজ
প্রারম্ভিকা: ইতিহাসের এক ক্রান্তিকাল

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় কালখণ্ডগুলো কখনো কখনো এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়ায়, যখন মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের অধিপতিদের উচ্চারিত শব্দরাজি কেবল কূটনৈতিক ভাষ্য হয়ে থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে একেকটি প্রলয়ঙ্করী অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। বর্তমান বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের হঠকারী সিদ্ধান্ত, বাক্যবাণের অসংযম এবং দূরদৃষ্টিহীন আচরণ ঠিক তেমনই এক বিপজ্জনক অনুঘটক। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমি থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি—কোথাও আজ স্থিতিশীলতার সমীরণ নেই। সমগ্র বিশ্ব আজ এক অনিশ্চিত বারুদের স্তূপের ওপর দণ্ডায়মান, আর সেই স্তূপে দহন-উসকানি দিচ্ছেন খোদ বিশ্ব-মোড়ল।
শব্দ যখন সংহারক: বাক্যের অলংকারে রণহুঙ্কার
রাষ্ট্রনায়কের ভাষা হওয়া উচিত প্রশান্ত মহাসাগরের মতো গভীর এবং হিমালয়ের মতো সুউচ্চ ও সংহত। কিন্তু বর্তমান ওয়াশিংটনের অলিন্দ থেকে নির্গত হওয়া শব্দরাজি প্রায়শই শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করে উদ্ধত ও হঠকারী হয়ে উঠছে। কূটনীতির ধ্রুপদী ব্যাকরণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে টুইট কিংবা সংবাদ সম্মেলনে উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য যেন একেকটি অদৃশ্য ক্ষেপণাস্ত্র। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অমোঘ সত্য এই যে—'শব্দও এক সংহারক অস্ত্র'। যখন একটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রের শীর্ষনেতা হুমকির সুরে রণধ্বনি দেন, তখন তা কেবল রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর থাকে না; তা রূপ নেয় সভ্যতার সম্ভাব্য ধ্বংসের এক করাল পূর্বাভাসে।
বিশেষত ইরানকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রশাসনের একতরফা চুক্তিভঙ্গ এবং অমানবিক নিষেধাজ্ঞার যে খড়্গ, তা কেবল তেহরানকে নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার মেরুদণ্ডকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে। এখানে প্রশ্ন জাগে—এ কি কোনো প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনীতি, না কি কোনো ব্যক্তিবিশেষের অহমিকার নগ্ন আস্ফালন?
আইনের বিচ্যুতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অরাজকতন্ত্র
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার ভিত্তি ছিল আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক আদালতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল সভ্যতার রক্ষাকবচ। কিন্তু বর্তমান মার্কিন নেতৃত্ব অবলীলায় সেই রক্ষাকবচকে ছিন্নভিন্ন করছে। নিজের স্বার্থে আইনের বিকৃতি আর অন্যের বেলায় আইনের কঠোর প্রয়োগ—এই দ্বিমুখী নীতি বিশ্বরাজনীতিতে এক ভয়ংকর নৈরাজ্যবাদ সৃষ্টি করছে।
যখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক আইনকে তুচ্ছজ্ঞান করে, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়ভার প্রহসনে পরিণত হয়। ইউক্রেনের রক্তাক্ত প্রান্তর, গাজার আকাশচুম্বী আর্তনাদ কিংবা ইয়েমেনের কঙ্কালসার মানবতা—সবই যেন এই 'একমেরু' স্বেচ্ছাচারিতার নির্মম বলি।
অদূরদর্শিতা: ক্ষমতার দম্ভে ভবিষ্যতের বলিদান
প্রকৃত নেতৃত্ব কেবল বর্তমানের ফসল ঘরে তোলা নয়, বরং অনাগত ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী বিনির্মাণ করা। কিন্তু বর্তমান মার্কিন নেতৃত্বের দৃষ্টি কেবল স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক লাভ ও অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তার সস্তা বৈতরণী পার হওয়ার দিকে নিবদ্ধ। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তারা বিস্মৃত হয়েছেন যে, একটি অঞ্চলে অস্থিরতার আগুন জ্বালিয়ে দিলে তার ধোঁয়া সারা বিশ্বের আকাশকে অন্ধকার করে দেয়।
ইরানের সাথে সম্পর্কের অবনতি মানে কেবল একটি রাষ্ট্রকে একঘরে করা নয়; এটি জ্বালানি বাজারের ভারসাম্যহীনতা, মুদ্রাস্ফীতির জাঁতাকল এবং উদ্বাস্তু সংকটের এক অন্তহীন মিছিলে বিশ্বকে ঠেলে দেওয়া। ক্ষমতার উচ্চাসনে বসে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে, তার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে।
নেতৃত্বের আড়ালে আধিপত্যের কুৎসিত অবয়ব
একদা যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের 'তাতাশ' বা আলোকবর্তিকা হিসেবে দাবি করত। কিন্তু আজ সেই দাবির অন্তঃসারশূন্যতা প্রকট। সহযোগিতার স্থলে বলপ্রয়োগ, সংলাপের স্থলে নিষেধাজ্ঞা এবং নৈতিকতার স্থলে পেশ পেশিশক্তির আস্ফালনই আজ তাদের প্রধান কৌশল। এই আধিপত্যকামী আচরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদেরও আজ সন্দিহান করে তুলেছে। ইউরোপ আজ দ্বিধাগ্রস্ত, এশিয়া খুঁজছে নিজস্ব পথ, আর লাতিন আমেরিকা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এই একরোখা প্রভুত্ববাদ থেকে।
উপসংহার: ইতিহাসের মহাকালের রায়
সভ্যতা আজ এক ঘোরতর নৈতিক সংকটের সম্মুখীন। যখন শান্তির রক্ষক হওয়ার কথা ছিল যাকে, সেই যখন অস্থিরতার প্রধান কারিগর হয়ে ওঠে, তখন ইতিহাসের চাকা থমকে দাঁড়ায়। ক্ষমতার চরম কেন্দ্রীভবন যখন জবাবদিহিহীন হয়ে পড়ে, তখন তা মানবজাতির জন্য এক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়।
ইতিহাস সাক্ষী আছে—কোনো সম্রাট বা কোনো মহাশক্তিই চিরকাল সত্য ও ন্যায়কে পদদলিত করে টিকে থাকতে পারেনি। আজ যারা ক্ষমতার মদমত্ততায় বিশ্বকে এক বিপন্ন গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, মহাকালের কাঠগড়ায় তাদের বিচার হবেই। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ একটাই—দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, মার্জিত ভাষা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবিচল আনুগত্য। নচেৎ, ইতিহাসের পাতায় বর্তমান সময়টি কেবল একটি ধ্বংসোন্মুখ সভ্যতার করুণ আর্তনাদ হিসেবেই লিপিবদ্ধ থাকবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী