খাজা খান জাহান আলী (রহঃ): মানবতা, দ্বীন ও সভ্যতা গঠনের এক অনন্য অধ্যায়, ডলি আক্তার মাইজভাণ্ডারী
ইতিহাস কেবল রাজা–বাদশাহদের ক্ষমতার গল্প নয়; ইতিহাস মূলত সেইসব আলোকিত মানুষের জীবনকথা, যাঁরা ক্ষমতার চেয়েও মানবতাকে বড় করে দেখেছেন। দক্ষিণ বাংলার ইতিহাসে তেমনই এক মহান আল্লাহর অলি ও মহামানব হলেন খাজা খান জাহান আলী (রহঃ)। তিনি ছিলেন একাধারে সুফি দরবেশ, সমাজ সংস্কারক, দূরদর্শী শাসক এবং নিঃস্বার্থ দাঈ—যাঁর কর্ম ও আদর্শ আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোকিত করে চলেছে।
সুফি সাধনা ও মানবিক নেতৃত্ব
খাজা খান জাহান আলী (রহঃ) ইসলামের দাওয়াতকে কখনো শক্তি বা জবরদস্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করেননি। তাঁর দাওয়াতের মূল ছিল আখলাক, ভালোবাসা, ইনসাফ ও মানবিক আচরণ। মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল হৃদয়ের সম্পর্ক—যেখানে বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে ভালোবাসা থেকে, ভয় থেকে নয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যিকারের দ্বীনদারি মানে কেবল ইবাদতে সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং মানুষের কষ্ট লাঘব করা, সমাজ গড়া এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া।
দক্ষিণ বাংলার জনপদ গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা
পনেরো শতকের দিকে দক্ষিণ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল জলাভূমি, গভীর জঙ্গল ও অনাবিষ্কৃত ভূমিতে পরিপূর্ণ। খাজা খান জাহান আলী (রহঃ) সেই প্রতিকূল পরিবেশকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলেন। তিনি পরিকল্পিতভাবে দিঘি খনন, সড়ক নির্মাণ, জনপদ স্থাপন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন। এসব উদ্যোগের ফলে মানুষ কৃষিকাজ, ব্যবসা ও সামাজিক জীবনে স্থিতি লাভ করে।
স্থাপত্য ও জনকল্যাণমূলক অবদান
খাজা খান জাহান আলী (রহঃ)-এর অবদান শুধু আধ্যাত্মিক বা সামাজিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; স্থাপত্য ও জনকল্যাণেও তিনি রেখে গেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ তাঁর ইখলাস, দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার নীরব সাক্ষ্য। এছাড়াও অসংখ্য মসজিদ, দিঘি ও জনকল্যাণমূলক স্থাপনা তিনি নির্মাণ করেন, যা মানুষকে দিয়েছে ইমান, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ।
আদর্শ ও শিক্ষা
খাজা খান জাহান আলী (রহঃ)-এর জীবন আমাদের শেখায়—ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের এক পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশনা। তাঁর আদর্শে নেতৃত্ব মানে শোষণ নয়, সেবা; ক্ষমতা মানে দম্ভ নয়, দায়িত্ব। তিনি এমন এক সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ মানুষকে নিরাপত্তা দেবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই হবে চূড়ান্ত লক্ষ্য।
উপসংহার
আজও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ ও আশপাশের স্থাপনাগুলো নীরবে সাক্ষ্য দেয়—একজন আল্লাহওয়ালার ইখলাস ও নিষ্ঠা কিভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে থাকে। খাজা খান জাহান আলী (রহঃ)-এর জীবন ও কর্ম আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় এমন মানুষ হতে, যারা কেবল নিজেদের জন্য নয়, বরং উম্মাহ ও সমগ্র মানবতার কল্যাণে বেঁচে থাকে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে খাজা খান জাহান আলী (রহঃ)-এর আদর্শ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তৌফিক দিন—যাতে আমরা মানবতার খেদমতে আত্মনিয়োগ করতে পারি। আমিন।
Doli Akter Maizbandari
৫ই জানুয়ারি ২০২৬ ইংরেজি
রোজ- সোমবার।।
#খাজা_খান_জাহান_আলী
#রহমাতুল্লাহি_আলাইহি
#ইসলামের_আলোকিত_ইতিহাস
#বাংলার_সুফি
#ষাটগম্বুজ_মসজিদ
#ইখলাস
#মানবতার_খেদমত
#ইসলাম_ও_সভ্যতা
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী