১৬ ডিসেম্বর: বিজয়ের নীলিমায় রক্তের স্বাক্ষর ও স্বাধীনতার অমর অভিযাত্রা
-আশরাফুল আলম তাজ
ডিসেম্বরের আকাশ সেদিন ছিল অদ্ভুতভাবে নীল—সে নীলিমায় ছিল না কোনো নির্লিপ্ততা, ছিল আসন্ন বিজয়ের দীপ্ত প্রত্যয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির ইতিহাসে কেবল একটি তারিখ নয়; এটি একটি জীবনদর্শন, একটি চেতনার পুনর্জন্ম, একটি রক্তস্নাত প্রতিজ্ঞার সফল মহাজাগরণ। এটি সেই মহেন্দ্রক্ষণ, যেদিন দীর্ঘ নয় মাসের অগ্নিদগ্ধ পথ পেরিয়ে একটি জাতি দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিল: “আমরা পরাধীন নই, আমরা স্বাধীন!”
এ বিজয় কোনো আকস্মিক সৌভাগ্য বা করুণার দান ছিল না। এটি ছিল লক্ষ শহীদের রক্তাক্ষরে লেখা এক মহাকাব্য, অগণিত জননীর অশ্রুসিক্ত এক গৌরবগাথা, আর নিঃস্ব মানুষের অদম্য প্রত্যয়ে নির্মিত এক অপরাজেয় ইতিহাস-ভাস্কর্য, যার পরতে পরতে মিশে আছে আত্মমর্যাদার অহংকার।
পরাধীনতার দীর্ঘ নিশি ও দ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ
বাংলার ইতিহাস পরাধীনতার দীর্ঘ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাষা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক অধিকার—সবকিছুই ছিল ঔপনিবেশিক ও নব্য-ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর নির্মম অবহেলা ও শোষণের শিকার। কিন্তু সহস্র বছরের এই জাতিসত্তা কখনো নীরবে অপমান সয়নি; সে শিখেছিল দ্রোহের ভাষা।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—এসব ছিল সেই সুপ্ত দ্রোহের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যা একদিন অনিবার্যভাবে দাবানলে রূপ নেবে। এর পূর্ণতা আসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের বজ্রকণ্ঠের আহবানে, যেখানে তিনি কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। অতঃপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পাশবিক “অপারেশন সার্চলাইট” সেই দাবানলে ঘৃতাহুতি দেয়। ঢাকা থেকে গ্রামবাংলা পর্যন্ত জনপদ রক্তস্রোতে ভেসে যায়, স্তব্ধ হয়ে যায় মানবতা। কিন্তু সেই রক্তপাতই হয়ে ওঠে স্বাধীনতার উর্বর বীজতলা; জন্ম নেয় প্রতিরোধের অদম্য স্পৃহা।
মুক্তিযুদ্ধ: অস্ত্রের নয়, চেতনার মহাযুদ্ধ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেবল বন্দুক ও গোলার সংঘর্ষ দিয়ে বিচার করা যায় না; এটি ছিল আত্মার মুক্তির ও চেতনার মহাযুদ্ধ। এটি ছিল অধিকারবঞ্চিত, শোষিত মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। রণক্ষেত্রের পরিধি ছিল বিস্তৃত—কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, নারী, কিশোর—সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে দৃপ্ত শপথ নিয়েছিল: “এই দেশ আমার, এই পবিত্র মাটিতে আমি আর দাস হয়ে থাকব না।”
রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা লড়েছেন অস্ত্র হাতে, আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে প্রেরণার অদৃশ্য দুর্ভেদ্য প্রাচীর রচনা করেছিলেন আপামর সাধারণ মানুষ। তারা ছিলেন গেরিলা, আশ্রয়দাতা, সেবক ও প্রেরণার উৎস। যে মা তাঁর সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন: “ফিরে এসো বিজয়ের পতাকা নিয়ে, নইলে লাশ হয়ে।” এই আত্মত্যাগ কোনো ক্ষণিকের আবেগ ছিল না; ছিল ইতিহাস রচনার জন্য সমস্ত সত্তাকে নিবেদন করার এক দৃঢ় ও ঐশী প্রত্যয়। এই যুদ্ধ ছিল ন্যায় ও অন্যায়ের, মানবতা ও পাশবিকতার মধ্যকার এক অনিবার্য সংঘর্ষ।
১৬ ডিসেম্বর: আত্মসমর্পণের নয়, আত্মমর্যাদার জাগরণ
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১—ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ ছিল কেবল একটি সামরিক পরাজয় নয়; এটি ছিল অন্যায়ের পরাজয়, দম্ভের পতন এবং মানবতার পরম বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে সেদিন জন্ম নিল একটি নতুন রাষ্ট্র—বাংলাদেশ, যা একটি স্বাধীন মানচিত্র, একটি সার্বভৌম পরিচয়।
এই দিনটি আমাদের এক চিরন্তন সত্য শিখিয়ে দেয়: পরাজিত মানুষ নয়, পরাজিত হয় অন্যায় ও অশুভ শক্তি। নিঃস্ব জাতি নয়, নিঃশেষ হয় শোষণ ও নিপীড়ন। সেদিন সবুজের বুকে রক্তলাল সূর্যখচিত পতাকা উড়েছিল শুধু আকাশে নয়—উড়েছিল প্রতিটি বাঙালির বুকের গভীরে, স্বাধীনতার চিরন্তন প্রতীক হয়ে। এ বিজয় ছিল আমাদের জাতিসত্তার আত্মমর্যাদার জাগরণ, যার মধ্য দিয়ে বাঙালি লাভ করে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার।
বিজয়ের দায়: স্মৃতি থেকে দায়িত্বে উত্তরণ
বিজয় অর্জন যত কঠিন, সেই বিজয়কে অর্থবহ করে তোলা তার চেয়েও কঠিনতর। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের কেবল আনন্দ আর উল্লাসের অধিকার দেয় না; দেয় ঐতিহাসিক দায়িত্বের ভার। বিজয়ের এই মর্মার্থটি অত্যন্ত স্পষ্ট: মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠা করা।
আমাদের দায়িত্ব হলো:
শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা: যেখানে মানুষে মানুষে কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক বৈষম্য থাকবে না।
সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণ করা: যেখানে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ নির্ভয়ে, ভ্রাতৃত্ববোধ নিয়ে বাস করবে।
গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: যা ছিল লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
যে মহান আদর্শে শহীদরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই আদর্শ বিসর্জন দিলে বিজয় নিছক একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হবে—এটাই ইতিহাসের নির্মম সত্য। আমাদের এই স্মৃতিচারণকে অবশ্যই দায়িত্বের দৃঢ় উত্তরণে রূপ দিতে হবে। কারণ, স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ডের নয়, তা চেতনারও মুক্তি।
সমাপ্তি: বিজয় চিরন্তন হোক চেতনায়
১৬ ডিসেম্বর কোনো অতীতকালের স্থির স্মৃতি নয়; এটি একটি চলমান অঙ্গীকার ও পুনর্নবীকরণের শপথ। যতদিন বাংলার মাটিতে অন্যায়, বৈষম্য ও অবিচারের বিরুদ্ধে একটি কণ্ঠও উচ্চকিত হবে, ততদিন মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনা জীবন্ত থাকবে।
এই বিজয় আমাদের অহংকার নয়, আমাদের শপথের ভিত্তি—
শহীদের রক্ত যেন কখনো অর্থহীন না হয়,
স্বাধীনতা যেন কেবল পতাকার কাপড়ে সীমাবদ্ধ না থাকে,
আর বাংলাদেশ যেন হয় সেই আদর্শের সোনার দেশ—
যার জন্য ১৯৭১ সালে মানুষ হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল। বিজয় আমাদের কাছে অনন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে চিরন্তন থাকুক।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী