শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: চেতনার অমল শিখা ও আত্মত্যাগের নক্ষত্রখচিত অর্ঘ্য - আশরাফুল আলম তাজ
আকাশের গায়ে যখন স্বাধীনতার ঊষালোক ঝলমল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তার পূর্বমুহূর্তে—একাত্তরের রক্তস্নাত ডিসেম্বরের মধ্যাহ্নে—বাঙালি জাতি প্রত্যক্ষ করল ইতিহাসের এক নিদারুণ কালো মেঘের অশুভ ছায়া। প্রতি বছর ১৪ই ডিসেম্বর এলে জাতির মানসপটে ভেসে ওঠে সেই বিভীষিকাময় দিনটি, যেদিন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের এদেশীয় দোসররা সুপরিকল্পিতভাবে ভেঙে দিতে চেয়েছিল জাতির মেধাবী মেরুদণ্ড। এই দিনটি কেবল শোকের দিন নয়—এটি আত্মত্যাগের শাশ্বত মহাকাব্য, বাঙালি চেতনার অমল শিখার চিরন্তন প্রতীক। প্রজ্ঞা ও আত্মদানের এক নক্ষত্রখচিত অর্ঘ্য নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আজও আমাদের ইতিহাসের সম্মুখ সারিতে দীপ্যমান।
আলোকের অগ্রদূত: প্রজ্ঞা ও প্রতিবাদের ফল্গুধারা
বুদ্ধিজীবীগণ ছিলেন একটি জাতির মননশীলতার অক্ষ, সমাজের অন্তর্দৃষ্টির প্রকোষ্ঠ। দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসন ও সাংস্কৃতিক নিষ্পেষণের যাঁতাকলে পিষ্ট বাঙালিকে তাঁরাই শিখিয়েছিলেন আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে।
জ্ঞানের ঐশ্বর্য: তাঁদের জ্ঞান বিতরণ ছিল নিছক শিক্ষাদান নয়; ছিল চেতনা সঞ্চালনের এক ঐশ্বর্যময় প্রক্রিয়া। তাঁদের লেখনী ও কণ্ঠস্বর শোষণের বিরুদ্ধে হয়ে উঠেছিল ধ্রুপদী প্রতিবাদ, যা বাঙালির অন্তরে জাতীয়তাবাদের বীজমন্ত্র বপন করেছিল—ঠিক যেন এক নীরব সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
মুক্তিযুদ্ধের জ্যোতিষ্ক: মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁদের যুক্তিনিষ্ঠ কলম ও প্রত্যয়ী কণ্ঠস্বর জনতাকে দিয়েছিল নৈতিক সমর্থন ও সাহস। তাঁরা ছিলেন মুক্তিসংগ্রামের অদৃশ্য সেনাপতি, যাঁরা আদর্শের মশাল হাতে আঁধার ভেদ করে জাতিকে পথ দেখিয়েছিলেন।
এই কারণেই পাকিস্তানি সামরিক চক্রের কাছে বিষয়টি ছিল স্পষ্ট—এই আলোকবর্তিকাগুলো নিভিয়ে না দিলে সদ্যোজাত রাষ্ট্রকে দুর্বল করা সম্ভব নয়। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল ভূখণ্ড দখল নয়, বরং একটি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধ্যাত্বের করাল গ্রাসে নিক্ষেপ করা।
বিভীষিকার চূড়ান্ত অঙ্ক: ১৪ই ডিসেম্বরের কালো রাত
যখন বিশ্বশক্তি জেনে গিয়েছিল যে, ঢাকার পতন আসন্ন, যখন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ক্ষণ ঘনিয়ে এসেছে—ঠিক তখনই সংঘটিত হলো ইতিহাসের এক অন্ধকারতম ও নারকীয় হত্যাকাণ্ড।
মুক্তিযোদ্ধারা তখন বিজয়ের তোরণ উন্মোচনে ব্যস্ত,
আর ঘাতকের দল রাতের আঁধারে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল জাতির উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের।
এটি নিছক হত্যা ছিল না—এ ছিল সদ্য-প্রসূত রাষ্ট্রের জ্ঞানভাণ্ডারে চালানো এক নির্মম অগ্নিসংযোগ।
নীল নকশার শৈল্পিক বীভৎসতা: আল-বদর ও আল-শামসের মতো ঘাতকগোষ্ঠী সুচারুভাবে শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী ও শিল্পীদের তালিকা প্রস্তুত করেছিল—যা কার্যত ছিল মৃত্যুর পরোয়ানা। কারফিউয়ের নিস্তব্ধতাকে আশ্রয় করে তাঁদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
ট্র্যাজেডির মানচিত্র: রায়েরবাজার বধ্যভূমি আজ তাই শুধু একটি স্থান নয়—এটি বাঙালি জাতির চিরন্তন ট্র্যাজেডির মানচিত্র, মানবতার এক নীরব সমাধিক্ষেত্র। এই হত্যাকাণ্ডের উপমা ছিল এমন—যেন একটি উদীয়মান গাছের গোড়া কেটে দেওয়া, যাতে তার ফলন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, ডা. ফজলে রাব্বীর মতো জ্ঞান-তপস্বীদের রক্তে ভেজা মাটি আজও সেই আর্তনাদের স্তব্ধ প্রতিধ্বনি বহন করে।
আত্মত্যাগের ফলশ্রুতি: অমোঘ উত্তরাধিকার
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে পরাজিত করেছে শহীদদের অমোঘ আদর্শের অমরত্ব। তাঁদের রক্তদান রেখে গেছে এক অমূল্য উত্তরাধিকার।
অপূরণীয় শূন্যতা ও ক্ষত: এই ক্ষতি ছিল অপূরণীয়, যা ছিল জাতির হৃদয়ে চিরস্থায়ী ক্ষতচিহ্ন। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশকে দীর্ঘকাল ধরে এই মেধাশূন্যতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। আমরা যেন এমন এক পর্বতচূড়ায় আরোহণ করছিলাম, যার দক্ষিণ হস্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
আদর্শের দীপ্তশপথ ও ঋণের বন্ধন: তাঁদের স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নই হলো তাঁদের প্রতি আমাদের অনাদায়ী ঋণের পরিশোধের পথ।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: স্মৃতির যথাযথ মর্যাদা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক স্তম্ভ, যা আমাদের নৈতিক মানদণ্ডকে স্থির করে দেয়। স্মৃতির পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের প্রথম কর্তব্য। এটি কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি জাতীয় আত্মার শুদ্ধতম মুহূর্ত।
সরকার তথা রাষ্ট্রের উচিত, সকল মত ও পথের মানুষকে এই দিনগুলোর মূল চেতনায়—অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারে—একত্রিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। এই দিনের আলোচনায় এমন কোনো কূটনৈতিক বা কৌশলগত ভাষা পরিহার করা বাঞ্ছনীয়, যা ইতিহাস বা আত্মত্যাগের কেন্দ্রীয় চরিত্র থেকে জনগণের মনোযোগ ভিন্ন দিকে চালিত করে।
সমাপ্তি: চেতনার অমল শিখা ও কালজয়ী প্রার্থনা
এই দিনে আমরা তাঁদের আত্মার প্রতি নিবেদন করি গভীর শ্রদ্ধার অঞ্জলি, আর নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখি—যে প্রজ্ঞা ও মূল্যবোধের জন্য তাঁরা জীবন দিয়েছেন, আমরা কি তা যথাযথভাবে লালন করছি?
তাঁদের রক্তদান বৃথা যেতে পারে না।
তাঁদের স্বপ্নই হোক আমাদের পথচলার আলোকস্তম্ভ।
তাঁদের আদর্শের অমল শিখা চিরকাল জ্বলে উঠুক আমাদের জাতীয় জীবনে—আশা, জ্ঞান ও মানবিকতার অবিনাশী প্রদীপ হয়ে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী