কক্সবাজার: নোনা জল, মহাকাব্য ও কালের সাক্ষর - আশরাফুল আলম তাজ
[স্বকীয় অনুধ্যান:] এই প্রবন্ধের জন্মসূত্র আমার সাম্প্রতিক এক গভীর অনুভূতি থেকে। বিগত ০৭ থেকে ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে আমি সপরিবারে কলাতলি সৈকতের একটি অবকাশ কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছিলাম; নোনা জলের অনিবার্য আহ্বান এবং সমুদ্রের অনিন্দ্য সৌন্দর্য—সেই প্রত্যক্ষ মহাকাব্যিক উপলব্ধি এই রচনার মূল প্রেরণা।
কক্সবাজার—যে নামটি উচ্চারিত হওয়ামাত্রই চেতনার গভীরে যেন এক অনন্ত জল-লহরী আছড়ে পড়ে, যা একই সঙ্গে নম্র এবং দুর্বার। এই উপকূল শুধুমাত্র সৌম্য সৌন্দর্যের এক উন্মুক্ত গবাক্ষ নয়; এটি সহস্রাব্দীর আবর্তন, লবণ-বণিকদের ঐতিহাসিক পদচিহ্ন এবং নানা জাতিগোষ্ঠীর জীবন্ত সংস্কৃতির এক মায়াবী মহামিলন ক্ষেত্র।
কক্সবাজার একদিকে যেমন পর্যটকের জন্য অনন্যসাধারণ স্বর্গোদ্যান, অন্যদিকে তেমনি সৃষ্টিশীল সাহিত্যিকের নিমিত্তে এক অনন্ত প্রেরণা। অবিশ্রান্ত জল-শব্দ, বারিসিক্ত সমীরণ, বালুকার স্নিগ্ধ গদ্যরূপ এবং নীলিম আকাশের অতল কাব্যিক ব্যঞ্জনায় সজ্জিত এই ভূমি এক অফুরন্ত সৃজনী উৎস।
ইতিহাসের পটভূমিতে প্রথম নীল স্বাক্ষর
খ্রিস্ট-পূর্ব যুগে এই উপকূল ছিল আরাকান (রাখাইন), বঙ্গ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের প্রধান মিলনকেন্দ্র। তৎকালীন কক্সবাজার ছিল লবণ-ভাণ্ডারী, মুক্তো-শিকারী এবং সমুদ্রাশ্রয়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এক শান্ত নিরালা আলয়।
তাদের জীবন ছিল তরঙ্গের ন্যায় সরল ও অবিচল—প্রভাতে মৎস্য-আহরণ, সায়াহ্নে সমুদ্রের চরণে গীত-নিবেদন। মনে হতো সমুদ্রই যেন এক অনন্ত আচার্য, আর মানুষ তার বিনয়ী শিষ্যকুল।
এই মানুষগুলোই রচনা করেছে সহস্র-বর্ষব্যাপী এক নিগূঢ় সাংস্কৃতিক বুনন—যার ছায়া-রঙ আজও প্রতিবিম্বিত হয় রাখাইন সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী নৌকা উৎসব, মৃত্তিকা-নির্মিত গৃহের গভীর বাদামী আচ্ছাদন এবং সমুদ্র-সিক্ত মুখের নির্মল হাসিতে।
আরাকান রাজবংশ ও ভিনদেশি বাণিজ্যের ছায়াপাত
দশম শতক থেকে সপ্তদশ শতক ছিল কক্সবাজারের ইতিহাসে বর্ণময় অথচ চঞ্চল এক সংঘাতময় কাল। আরাকান রাজন্যবর্গ এখানে স্থাপন করেন শক্তিশালী নৌ-বন্দর, সৈন্যাবাস ও রাখাইন জনপদ। তাদের উৎসব-পদ্ধতি, বৌদ্ধ উপাসনার প্রাচীন ধারা, বস্ত্রশিল্পের সূক্ষ্ম কারুকার্য এবং নৌকার ফলকে সূর্যচিহ্ন অঙ্কনের নিগূঢ় ঐতিহ্য—সবই আজও এই জনপদের কণিকায় কণিকায় স্পন্দিত।
এই সময়েই পর্তুগিজ নাবিকদের আগমনে সমুদ্রপাড় যেন এক অজানা রহস্য-দ্বার উন্মোচিত করে।
নৌকাগুলিতে উড়ত ভিনদেশি কেতন (পতাকা),
বাতাসে ভাসত দূর প্রাচ্যের সুগন্ধি পণ্যের সুরভি,
আর জ্যোতির্ময় নক্ষত্র মানচিত্র ধরে জল পাড়ি দিত দুঃসাহসী নাবিকেরা।
এই বিদেশি পদচারণা বয়ে এনেছিল বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত, অন্যদিকে সৃষ্টি করেছিল জলদস্যুতা ও মগ-ফিরিঙ্গিদের দৌরাত্ম্যের ভীতিময় উপাখ্যান।
কর্ণেল হিরাম কক্স: মানবতার স্থপতি ও নামের উৎস
অষ্টাদশ শতকে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে (১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) আবির্ভূত হন ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স—যিনি মানবিকতা ও পুনর্বাসনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আরাকান থেকে আগত নিরাশ্রয় লাখো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, খাদ্য-সংস্থান ও নিরাপদ আশ্রয় তৈরিতে তিনি ছিলেন অগ্রদূত। তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত বাজার ও বসতি থেকেই জন্ম নেয় 'Cox’s Bazaar' → কক্সবাজার।
অতএব কক্সবাজার কেবল একটি দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের নাম নয়—এটি একজন মানুষের মহৎ মানবতাবাদের চিরস্থায়ী স্মারক।
সাহিত্যিকের দৃষ্টিতে কক্সবাজার: ঢেউ যেন অশেষ দর্শন
কক্সবাজারের প্রতিটি প্রভাত সাহিত্যিকের চোখে এক নতুন মহা-অধ্যায়, প্রতিটি ঢেউ এক অনুচ্চারিত দর্শন, প্রতিটি ঝাউপাতা এক অতল নৈঃশব্দ্যের উপমা।
বাংলা সাহিত্যের বহু প্রজ্ঞাবান স্রষ্টাই এই সমুদ্রকে দেখেছেন অন্তহীন রূপক হিসেবে—
সৈয়দ শামসুল হকের কবিতায় পাওয়া যায় সমুদ্রের কিংবদন্তী-গূঢ়তা ও লোকজীবনের স্পন্দন,
নির্মলেন্দু গুণের শব্দে প্রতিধ্বনিত হয় তার জলদার্শনিক ভাবনা ও প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণের সুর,
হুমায়ূন আহমেদের গল্পে অনুভব করা যায় টেকনাফের বাতাসের ফিসফাস এবং নিভৃত প্রকৃতির রহস্যময়তা।
এই উপকূল শেখায়—প্রকৃতি কখনো বাহ্যিক শব্দ দিয়ে নয়, বরং অন্তর্নিহিত নীরবতা এবং কালের মহৎ স্পন্দন দিয়ে কথা বলে।
পর্যটনের বর্ণচ্ছটা—সৌন্দর্যের সপ্ত সিন্ধু
আজকের কক্সবাজার বাংলাদেশের নিঃসন্দেহে সৌন্দর্যের অধিরাজধানী।
দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সৈকত: একশত বিশ কিলোমিটার বিস্তৃত এই নীল বালুকাবন্ধন পৃথিবীর ইতিহাসে এক দুর্লভ প্রাকৃতিক বিস্ময়।
হিমছড়ি: পাহাড়, ঝর্ণা এবং ঘন অরণ্যের এক মনোরম চিত্রকাব্য।
ইনানী: অবারিত পাথুরে প্রবাল-ভূমি, হেমন্তের সায়াহ্ন এবং বুনো হাওয়ার এক রহস্যময় আবাস।
মহেশখালী: দ্বীপ, পাহাড়, আদিনাথ মন্দির, লবণচাষ এবং মৎস্যজীবনের এক স্থানে পাঁচটি পৃথক পরিবেশের মিলনকেন্দ্র।
টেকনাফ: বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ প্রান্ত, যেখানে সুউচ্চ পাহাড়মালা নেমে আসে নীলের বুকে।
সেন্ট মার্টিন: বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল-দ্বীপ, স্বচ্ছ জল এবং প্রবালের মায়াবী লঘুগান যার প্রধান আকর্ষণ।
কক্সবাজারকে নিছক ভ্রমণসূচি দিয়ে শেষ করা যায় না—এটি এক মহাকাব্য, যার প্রতিটি অধ্যায়ই অনুসন্ধিৎসু ভ্রমণকারীর হৃদয়ে নিজস্ব অবিস্মরণীয় ছাপ রেখে যায়।
রোহিঙ্গা সংকট ও মানবতার পুনর্জাগরণ
২০১৭ সালে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যখন গণ-নির্বাসিত হয়ে এই উপকূলে আশ্রয় নেয়, কক্সবাজার আবারও বিশ্ব মানবতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। সেই মুহূর্তে ক্যাপ্টেন কক্সের মানবতা যেন সমুদ্র-বাতাসের মতো পুনরায় নবউদ্যমে জেগে ওঠে।
এ উপকূল প্রমাণ করে—মানবতা সমুদ্রের মতোই বিরাট ও সীমাহীন, এবং আশ্রয় দেওয়া তরঙ্গের মতোই স্বাভাবিক ও আবশ্যিক।
আজকের কক্সবাজার—আলো, ইতিহাস ও কল্পনার ত্রিমাত্রিক বিস্ময়
আজ কক্সবাজার—
আধুনিক পর্যটনের আলোয় উজ্জ্বল,
ইতিহাসের গভীরতায় সমৃদ্ধ,
সাহিত্যিক কল্পনায় অনিঃশেষ উৎসভূমি।
এ স্থানে ভ্রমণ মানে—সময়ের, প্রকৃতির এবং শাশ্বত রূপকথার ত্রিভুজে একসঙ্গে গভীরভাবে ডুব দেওয়া।
এটি কেবল দর্শন করা যায় না—এটি শ্রবণ করা যায়, অন্তরে অনুভব করা যায়, সময়ের পদচিহ্ন স্পর্শ করা যায়, আর হৃদয়ের অন্তরালোকে জমা থাকে ঢেউয়ের অবিচল সঙ্গীতে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোহাম্মদ মহররম হোসেন মাহ্দী